মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:২০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
আগামীকাল পবিত্র শ্রাবণী পূর্ণিমা

আগামীকাল পবিত্র শ্রাবণী পূর্ণিমা


আগামীকাল পবিত্র শ্রাবণী পূর্ণিমা। ০২ আগস্ট ২০২০ ইং, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৭ বাংলা, ২৫৬৪ বুদ্ধাব্দ। পূর্ণিমা আরম্ভ রবিবার রাত ৯ টা ৩১ মি. থেকে সোমবার রাত ৯ টা ১৫ মি. পর্যন্ত।

শ্রাবণী পূর্ণিমাঃ প্রথম সঙ্ঘায়ন ও
আনন্দ স্থবিরের অর্হত্ব লাভ

প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্খু:

আগামীকাল শুভ শ্রাবণী পূর্ণিমা। প্রথম বৌদ্ধ সঙ্ঘায়ন বা সংগীতি ও আনন্দ স্থবিরের অর্হত্ব লাভের পূণ্যময় বার্তায় শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথি সমগ্র বৌদ্ধ বিশ্বের কাছে অন্যতম ধর্মীয় উৎসব তথা পর্বদিন হিসেবে গতকাল পালিত হয়। পবিত্র এ পূণ্য দিবসটি আমাদের বাংলাদেশেও ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য্যে, দান, উপোসথ শীল গ্রহণ, ভাবনানুশীলন, ধর্মশ্রবণ ইত্যাদি কুশল কর্ম সম্পাদনের মধ্যদিয়ে উদ্যাপিত হয়।

এবার আমরা এ পূণ্য তিথির বিশেষত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব। সূত্র, বিনয়, অভিধর্ম এ তিন পিটকের সমন্বয়ে যে ত্রিপিটক বৌদ্ধধর্মের প্রধান গ্রন্থ, সে ত্রিপিটক সংকলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বুদ্ধের সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ভাষিত ধর্মোপদেশ সমূহ পুস্তকাকারে লিপিবদ্ধ ছিলনা। সংগীতি আয়োজনের মধ্যদিয়ে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এভাবে এক এক করে ছয়টি সংগীতি আয়োজিত হয়।

সংগীতি (সম+গীত) অর্থ হল ধর্মসভা, সমাবেশ, সম্মেলন, সঙ্ঘায়ন, অধিবেশন ইত্যাদি। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের তিন মাস পর অর্থাৎ চতুর্থ মাসে প্রথম সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। এ সংগীতি আয়োজনের প্রধান কারণ ছিল, সুভদ্র নামক বৃদ্ধ প্রব্রজিত ভিক্ষুর বিনয় বর্হিভূত উক্তি। তিনি বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্য করে বলেন-

হে ভিক্ষুগণ,
তোমরা শোক করিও না!
বিলাপ করিও না।
আমরা এখন মুক্ত। বুদ্ধের কঠোর ধর্ম অনুশাসন এখন আর আমাদের রক্ষা করতে হবে না। আমরা নিজেদের মত নিজেরাই চলতে পারবো। বুদ্ধের পরিনির্বাণে আমরা স্বাধীন।

ভিক্ষু সুভদ্রের মুখে এমন উক্তি শুনে বুদ্ধের প্রধান শিষ্য ও বিনয়শীল ভিক্ষুদের মাথায় যেন বাজ পরল! তাঁরা মহাকাশ্যপ স্থবিরের নিকট এ বিষয় উত্থাপন করেন। অতঃপর অর্হৎ মহাকাশ্যপ স্থবির রাজা বিম্বিসারের পুত্র মগধরাজ অজাতাশত্রুর পৃষ্ঠপোষকতায় রাজগৃহের বেভার পর্বতের সপ্তপর্ণী গুহায় পঞ্চশত অর্হৎ ভিক্ষুদের নিয়ে সংগীতির আয়োজন করেন।

এবার আসা যাক্ আনন্দ স্থবিরের অর্হত্ব লাভ প্রসঙ্গে। সংগীতির আয়োজন সম্পন্ন, কিন্তু আনন্দ স্থবির তখনো পর্যন্ত অর্হত্ব লাভ করেননি। উক্ত সংগীতিতে প্রবেশাধিকার রয়েছে শুধুমাত্র অর্হৎ ভিক্ষুরই, তদুপরি আনন্দ স্থবিরকে ব্যতীত সংগীতি আয়োজনও পূর্ণাঙ্গতা পাবে না। কারণ, তিনিই সুদীর্ঘ ২৫ বৎসর কাল অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় ঐকান্তিক শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সাথে বুদ্ধের সেবা করেছিলেন। তাঁর অবর্তমানে বুদ্ধ যেখানে গেছেন, যেসব ধর্ম দেশনা করেছেন; সেখান থেকে এসে সেসব ধর্মদেশনা পুনরায় আনন্দ স্থবিরের নিকট দেশনা করেছেন। সুতরাং, অর্হৎ মহাকাশ্যপ স্থবির সর্বসম্মতিক্রমে আনন্দ স্থবিরের জন্যও একটি আসন বরাদ্দ রাখেন।

এদিকে ভিক্ষুরা তাঁকে সংগীতিতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পরদিনই সংগীতির আয়োজন। আনন্দ স্থবির চিন্তা করলেন আমি এখনও তো অর্হৎ নই, আমার পক্ষে সংগীতিতে উপস্থিত হয়ে ধর্ম সঙ্ঘায়ন করা কি উচিত হবে? কখনো সংগীতিতে উপস্থিত হবেন ভেবেছেন, কখনো ভেবেছেন হবেন না! এভাবে নানা চিন্তা-ভাবনার পর তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন আমাকে যেকোনভাবেই অর্হত্ব মার্গফল লাভ করতেই হবে। সংগীতি আরম্ভের পূর্বরাতে তিনি কর্মস্থান ভাবনায় রত হলেন। নির্ঘুমে দীর্ঘরাত্রি পর্যন্ত চংক্রমণে বিদর্শন ভাবনা করতে করতে শেষ যামে শান্ত-ক্লান্ত দেহে একটু বিশ্রামের জন্য শষ্যাগ্রহণ করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। যখন পাদদ্বয় ভূমি হতে তুলে মঞ্চোপরি উপাধানে মস্তক স্থাপন করে শয়ন করবেন এমন সময় হঠাৎ তাঁর অন্তর আকাশ দিব্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তিনি বহু আকাঙ্খিত সাধনার উচ্চতর মার্গ অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হলেন (সাধু সাধু সাধু)।

সংগীতি শুরু হল। সম্মেলন মণ্ডপে বুদ্ধের দেশিত ধর্ম-বিনয়ে সুদক্ষ ৪৯৯ জন অর্হৎ ভিক্ষু উপস্থিত। আনন্দ স্থবিরের আসনই শুধুমাত্র শূন্য। সংগীতির কার্যক্রম সূচনার পূর্ব মুহুর্তেই আনন্দ স্থবির ঋদ্ধিবলে আসন অলঙ্কিত করলেন। উপস্থিত অরহত ভিক্ষুদের মধ্যে সাধু সাধু সাধু ধ্বনি উচ্চারিত হতে লাগল। এরপর ধুতাঙ্গ শ্রেষ্ঠ অর্হৎ মহাকাশ্যপ স্থবিরের সভাপতিত্বে সংগীতির কার্যক্রম শুরু হল। তিনি সমবেত ভিক্ষুসংঘের সম্মতিক্রমে বিনয়ধর উপালি স্থবিরকে প্রথমে বিনয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি ধর্মভাণ্ডারিক খ্যাত আনন্দ স্থবিরকে ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। আনন্দ স্থবির সুনিপুণ কন্ঠে যথাযথভাবে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করলেন। তিনি সূত্রাদি ও অভিধর্ম বর্ণনা করেন। এভাবে দীর্ঘ সাতমাস সঙ্ঘায়নের মধ্যদিয়ে প্রথম সংগীতিতে ধর্ম ও বিনয় ত্রিপিটকারে (বিনয়, সূত্র, অভিধর্ম) সুশৃ্ঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।

উপরোক্ত আলোচনায় আমরা শ্রাবণী পূর্ণিমার বিশেষত্ব সম্পর্কে অবগত হলাম। সংঙ্ঘায়নের মাধ্যমে সেসময় যেভাবে ভিক্ষুসংঘ শাসন পরিশুদ্ধ করেছেন, বর্তমানেও ভিক্ষুসংঘদের মাঝে সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক অনৈক্য দেখা যায়। আশাকরি পূজ্য ভিক্ষুসংঘ এসকল অনৈক্যের বিষয়সমূহ সাংঘিক সভা ও আলোচনার মধ্যদিয়ে সমাধান করবেন। ঠিক তদ্রুপ গৃহীদেরকেও পরিবার, সমাজকে নিয়ে সৃষ্ঠ বিভিন্ন সমস্যা এককভাবে নয়, সকলের সম্মতিক্রমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করে নিজেদের গৃহী জীবনকে ধর্মময়ভাবে গঠন করতে উদ্যোগী হতে হবে।

পরিশেষে, অনন্ত গুণসম্পন্ন বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘের প্রতি বন্দনা-পূজা, শ্রদ্ধা, ভক্তি অর্পণ পূর্বক দূরের-কাছের সকল জ্ঞাতী, বন্ধু, শত্রু-মিত্র, কল্যাণকামী-অকল্যাণকামী সর্বোপরি সকলের প্রতি শুভ শ্রাবণী পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানায় এবং জগতের সকল প্রাণীর হিত-সুখ, জয়মঙ্গল এবং দেশে-বিশ্বে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হোক এ শুভ প্রত্যাশা-প্রার্থনায় আমার অর্জিত পূণ্যরাশি দান করছি।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!