শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫৬ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
ভারতে নব বৌদ্ধ আন্দোলনের অগ্রদূত ভীমরাও আম্বেদকর

ভারতে নব বৌদ্ধ আন্দোলনের অগ্রদূত ভীমরাও আম্বেদকর


ভদন্ত বোধিরত্ন ভিক্ষু:

ধর্মীয় আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নব বৌদ্ধ আন্দোলন। এই আন্দোলনের সাথে একজনের নাম খুবই গুরুত্বের সাথে বিবৃত হয়। তিনি আর কেউ নন-তিনি হলেন ডক্টর ভীমরাও আম্বেদকর। নানাভাবে নানা বিশেষণে অভিহিত করা হয়ে থাকে ভীমরাও আম্বেদকরকে। তাঁকে নিয়ে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের ব্যাপক আগ্রহ। দলিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ড. আম্বেদকর। তিনি এক সময় ধর্মান্তরিত হন। নব বৌদ্ধ আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এক সময় ব্যাপক প্রচার লাভ করে। এই আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন ডক্টর ভীমরাও আম্বেদকর। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ নানা-মুনির উপস্থাপিত তথ্যের আলোকে বর্তমান নিবন্ধটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আইনবিদ, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, নৃতত্ত¡ববিদ, ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ ভীমরাও রামজি আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) ‘বাবাসাহেব’ হিসেবেই ভারতের দলিত সম্প্রদায়ের কাছে সুপরিচিত। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন- শোষণে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণীর মানুষের সামনে তিনি আলোর মশাল নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। জাতপাত থেকে দলিত সম্প্রদায়কে চিরতরে মুক্তি দিতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাকে ভারতীয় সংবিধানের পিতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। অরূন্ধতী রায় সম্প্রতি তাকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন, ‘দ্য ডক্টর এন্ড দ্য সেইন্ট’ নামে। অরূন্ধতী রায় মনে করেন, আম্বেদকরই ছিলেন ভারতের জাতির পিতা হিসেবে পরিচিত গান্ধীর সবচেয়ে বড় শত্রæ। তিনি তাকে কেবল রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নয়, বরং নৈতিকভাবেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। অরূন্ধতী রায়ের এই মত ডক্টর অফ দি সেইন্ট বইয়ে উল্লেখ হয়েছে। এখানে ভারতে নব বৌদ্ধ আন্দোলন ও ড. আম্বেদকর সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস করা হয়েছে।
নববৌদ্ধ আন্দোলন কী : উইকিপিডিয়াতে বলা হয়েছে, ‘দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন বা নববৌদ্ধ আন্দোলন (পালি : নবযান) হল বিংশ শতাব্দীতে সিংহলী বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সহায়তায় ভারতের দলিতগণকে নিয়ে গডতে ওঠা একটি বৌদ্ধ নবজাগরণ। ভারতের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ভীমরাও আম্বেদকর বর্ণাশ্রমভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য হিন্দুসমাজের নিন্দাপূর্বক সমস্ত দলিত অর্থাৎ শূদ্রাদি নিম্নবর্ণীয় ব্যক্তিগণকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হতে আহ্বান করেন এবং এর ফলে এই আন্দোলন বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।’ একইভাবে আরও বলা হয়েছে, ‘বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক শাক্যমুনি বুদ্ধের পরিনির্বাণলাভের অনতিকাল পরেই বৌদ্ধ ধর্ম বিপুল প্রসার লাভ করে এবং ভারতের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। কিন্তু খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতেই ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান এবং ইসলামের আগমনের ফলে ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম অবলুপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে সিংহলী বৌদ্ধ ভিক্ষু অনাগরিক ধর্মপাল কর্তৃক মহাবোধি সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পর উক্ত সংগঠনের নেতৃত্বাধীনে ভারতে পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মের নবজাগরণ সূচিত হয়। যদিও সেই সময় মহাবোধি সোসাইটি মূলত উচ্চবর্ণীয় ব্যক্তিদের বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।
বাবা সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর : অচ্ছুৎ পরিবারে পিতা রামজী মালোজী শকপাল ও মাতা ভীমাবাঈ-এর ১৪ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন আম্বেদকর। পারিবারিক নাম ভীমরাও। যদিও চৌদ্দজন ভাই-বোনের মধ্যে ৫ জন বেঁচে ছিলেন, ৩ ভাই ২ বোন। বলরাম, আনন্দরাও, মঞ্জুলা, তুলসী ও সর্বশেষ ভীমরাও। পৈতৃক বাড়ি ছিল তৎকালীন বোম্বাই প্রদেশের রতœগিরি জেলার আম্বেদাবাদ গ্রামে। পিতা রামজী শকলাল মধ্যপ্রদেশের ‘মোউ’ সেনানিবাসে চাকরিকালে ১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল আম্বেদকরের জন্ম। পুত্রের নাম রাখা হল ভীমরাও শকপাল। আম্বেদকর হল পার্শ্ববর্তী এক গাঁয়ের নাম। স্কুলজীবনে প্রবেশের পর এক ব্রাহ্মণ শিক কৌতূহলবশত শকপালের স্থলে ভীমরাও-এর সাথে জুড়ে দেন আম্বেদকর শব্দটি। সেই থেকে ভীমরাও শকপাল হয়ে গেল ভীমরাও আম্বেদকর। তাঁর পূর্বপুরুষদের অনেকেই ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন। তাঁর পিতামহ মালোজী শকপালও সৈনিক ছিলেন। মুরবাদ গ্রামের মুরবাদকর পরিবারের তাঁর মাতামহরাও ছিলেন সামরিক বাহিনীর সুবেদার-মেজর।
পিতা রামজী শকলাল মারাঠি ও ইংরেজিতে সাধারণ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে শিক্ষানুরাগ ও ধর্মপরায়ণতা তাঁর চরিত্রের অংশ হয়ে উঠেছিল। ফলে সন্তানদেরকে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। সাথে সাথে উৎসাহিত করতেন হিন্দু ধর্মের ক্লাসিকগুলো অধ্যয়নের জন্য। সেনাবাহিনীর সুবেদার হিসেবে সামরিক বাহিনীর চাকরি থেকে রামজী শকলাল ১৮৯৪ সালে যখন অবসর নেন তখন আম্বেদকরের বয়স মাত্র আড়াই বছর পেরিয়েছে। এর দু’বছর পরে রামজী বোম্বাই প্রদেশের সাতারার সেনাবানিবাসের একটি স্কুলে চাকরি জোগাড় করে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এরই মধ্যে আম্বেদকরের মাতা ভীমাবাঈ মারা গেলেন। ভীমাবাঈয়ের অকাল মৃত্যুতে শোকাভিভূত রামজী তাঁর একমাত্র বোন মীরাবাঈকে সংসার দেখাশুনার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে এলেন। তিনি সাংসারিক কাজে খুব অভিজ্ঞ ও কর্মঠ ছিলেন। ইতোমধ্যে ১৮৯৮ সালে আম্বেদকরের বাবা রামজী শকপাল পুনরায় বিয়ে করেন। আম্বেদকরের বয়স তখন ৭ বছরেরও কম। পিতার এই দ্বিতীয় বিয়েকে আম্বেদকরের শিশুমন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে অধিকাংশ সময় পিসীর সাহচর্যেই কাটাতেন। মাতৃহারা আম্বেদকরকে তিনি মাতৃস্নেহে বেঁধে রাখতেন।
ছেলের স্কুলে পড়ার বয়স হলে সেনাবাহিনীর চাকরির সুবাদে বহু অনুনয় বিনয় করে রামজী শকলাল তার পুত্রকে সরকারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেলেন। আম্বেদকরের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষাজীবন শুরু হল সাতারাতে। আর স্কুলজীবনের শুরুতেই হিন্দু সমাজের বর্ণবাদী জাতিভেদ প্রথা তথা অস্পৃশ্যতার অভিশাপের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা শুরু হল তাঁর। বাল্যকাল বা স্কুল জীবন থেকে প্রতি পদেক্ষেপে যেভাবে তিনি সামাজিক ব না, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়েছিলেন তখন থেকে তাঁর মধ্যে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার স্বপ্ন জাগ্রত হয়েছিল। তাঁর জীবনের সি ত অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে শক্তি যুগিয়েছে। এক সময় স্কুলে লাঞ্ছনা-গঞ্জনার কারণে স্কুল এবং পড়াশুনার প্রতি ঘোর বিতৃষ্ণা জন্মে যায় এবং প্রায়শই স্কুল পালাতে থাকেন তিনি। তবু লক্ষ্যকে তাঁর দৃষ্টি থেকে কখনও ফিরিয়ে নেননি। এদিকে বিমাতাকে মোটেই সহ্য করতে পারছিলেন না। ফলে কচি আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি এ পরিস্থিতিতে স্বাধীন জীবিকার্জনের কথা চিন্তা করে বোম্বাইতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু সেখানে যেতে অনেক টাকা পয়সার প্রয়োজন। তাঁর কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই। অগত্যা পিসীমার কোমরে বাঁধা থলিটির দিকে ভীমের নজর পড়লে একদিন তা ভাগিয়ে নিয়ে থলিটিতে প্রত্যাশিত পয়সা না পেয়ে অতিশয় হতাশ হয়ে পড়েন। আর এই সময়টাতেই তাঁর জীবনের আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়। তাঁর কথা থেকেই জানতে পারা যায় যে, এই পরিবর্তনের কারণেই তিনি পরবর্তীকালে নিজেকে ড. আম্বেদকর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন ‘ঠিক করলাম যে আমি স্কুল পালানোর অভ্যাস ত্যাগ করব এবং পড়াশুনার প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করব, যাতে যত শিগগিরই সম্ভব স্কুলের পাঠ সেরে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন শুরু করতে পারি।’ এরই মধ্যে চাকরির কারণে রামজী শকপাল সপরিবারে বোম্বাই চলে এলেন। ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিলেন যা ৬/৭ জন সদস্যের পক্ষে কোনোক্রমেই মাথাগোঁজা সম্ভব নয়। আম্বেদকরকে মারাঠা হাইস্কুলে ভর্তি করানো হল এবং স্কুলের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ পিতার সযতœ শিক্ষাদানে তাঁর পড়াশুনায় প্রভূত উন্নতি দেখা দিল। অন্য ভাইদের পড়াশুনা আর না হলেও পিতা রামজী ভীমের পাঠস্পৃহা দেখে চরম অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর জন্য বিভিন্ন বইপত্র সংগ্রহ করে আনতেন। পড়াশুনায় উত্তরোত্তর মনোযোগ ও উন্নতি লক্ষ্য করে তাঁকে বোম্বাইর বিখ্যাত স্কুল এলফিনস্টোন হাইস্কুলে ভর্তি করানো হল। আম্বেদকরই হলেন এলফিনস্টোন রোডের আশপাশের এলাকায় এখানকার প্রথম ও একমাত্র অস্পৃশ্য ছাত্র। এই নামকরা স্কুলে ভর্তি হয়ে শত অবহেলা অপমানের মধ্যেও পড়াশুনার প্রতি তাঁর মনোযোগ আরও বেড়ে গেল। কিন্তু যে পরিবেশের মধ্যে তাঁকে পড়াশুনা করতে হয়েছে তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়। সবার জন্য একটিমাত্র ঘর। সেখানে রান্নাবান্না, থাকা-খাওয়া, জ্বালানি কাঠের স্তুপ, ঘরের এক কোণে থাকত একটি ছাগলও। থাকার জায়গার অভাবে পিতা রামজী একটি কৌশল বের করলেন। সন্ধ্যার পর আম্বেদকর ঘুমোতে যেত এবং পিতা রামজী জেগে থেকে তাঁর পাঠ তৈরি করে দিতেন। রাত দু’টো বাজলে তিনি আম্বেদকরকে জাগিয়ে তার জায়গায় শুয়ে পড়তেন। আম্বেদকর সারারাত ধরে নিরিবিলিতে পড়াশুনা করতেন। একদিকে পারিবারিক অসুবিধা অন্যদিকে এলফিনস্টোন হাইস্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী স্কুলেও বর্ণহিন্দু সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা ও বিষোদ্গার সত্তে¡ও ১৯০৭ সালে এলফিনস্টোন হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
সে সময়কালে একজন অস্পৃশ্য মাহার (মতান্তরে মোহর) সম্প্রদায়ের ছেলের প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিকুলেশন পাস করা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলফিনস্টোন কলেজে আইএ ক্লাসে আম্বেদকরই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম কোনো অস্পৃশ্য ছাত্র। এই কৃতিত্বের জন্য তাঁর সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়, যার পৌরোহিত্য করেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক এস.কে. বোলে এবং সমাজসেবী শিক্ষক অর্জুন কেলুশকার, যিনি দাদা কেলুশকার নামে পরিচিত। কৃতিত্বের জন্য উচ্ছ¡সিত প্রশংসা ও উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহিত করে অর্জুন কেলুশকার প্রীতি উপহার হিসেবে ‘গৌতম বুদ্ধের’ একটি জীবনী গ্রন্থ আম্বেদকরের হাতে তুলে দেন। এই বইটিই পরবর্তীকালে আম্বেদকরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পট পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।
সে আমলে অল্প বয়সে বিয়ের রেওয়াজ থাকায় প্রবেশিকা পাস করার পর আম্বেদকরের আপত্তি সত্তে¡ও তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হল। দাপোলীর সগোত্রীয় সম্প্রদায়ের ভিখু ওয়ালঙ্করের নয় বছর বয়সী কন্যা রমাবাঈয়ের সাথে ভীমরাও আম্বেদকর (১৯০৮ সালে) মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই রমণীর গর্ভে তাঁর তিন পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হয়। কন্যা ইন্দু শৈশবেই মারা যায় এবং এক পুত্র রাজরতœ ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে মারা যায়। ১৯১০ সালে এলফিনস্টোন কলেজ থেকে আই.এ. পাস করার পর অর্থাভাবে তাাঁর লেখাপড়া বন্ধ হবার খবর পেয়ে শুভানুধ্যায়ী শিক্ষক অর্জুন কেলুশকার আম্বেদকরকে নিয়ে বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও গাইকোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করেন। সব শুনে মহারাজা তাঁর উচ্চশিক্ষা গ্রহণার্থে যাবতীয় সাহায্য প্রদানের প্রতিশ্রæতি দেন এবং তাঁকে একই কলেজে বি.এ. পড়ার খরচ জোগান। ১৯১২ সালে সেখান থেকে বি.এ. পাস করেন এবং ঠিক তার পরের বছর ১৯১৩ সালের ২ ফেব্রæয়ারি তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনের অন্যতম সহায়ক শক্তির উৎস পিতার মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হয়ে পড়লেও বর্ণবাদের শিকার হয়ে শৈশবের অপমান, নির্যাতন, অবজ্ঞা, অত্যাচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে অধিকার অর্জনের সংগ্রাম তাঁকে সর্বদাই তাড়িত করছিল। আর এ শুধু তাঁর নিজের অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, শত সহস্র বছরকাল ধরে নির্যাতিত, শোষিত, লাঞ্ছিত কোটি কোটি অস্পৃশ্য মানব সন্তানের মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাঁচার লড়াই। তা করতে হবে সেই কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সাথে যারা বিদ্যা, বুদ্ধি, ক্ষমতা, অর্থ, কূটনীতি, ধূর্ততায়, শঠতায়, হিংস্রতায়, ধর্মান্ধতায় বহুগুণ শক্তিশালী। এদের সাথে লড়তে হলে প্রথমে নিজেকে সেভাবেই যথোপযুক্তভাবে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। এই প্রস্তুতির জন্য চাই যত বেশি সম্ভব জ্ঞানবলে বলীয়ান হওয়া। জীবনের এ পর্যায়ে এসে আম্বেদকর যে আর দমবার পাত্র নন। তিনি দমে যাননি।
দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন : বুদ্ধধর্মের প্রবর্তক মহাকারুনিক বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের অনতিকাল পরেই বৌদ্ধধর্ম বিপুল প্রসার লাভ করে এবং ভারতের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। কিন্তু খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতেই ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান এবং ইসলামের আগমনের ফলে ভারতে বুদ্ধধর্ম অবলুপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে সিংহলি বৌদ্ধ ভিক্ষু অনাগারিক ধর্মপাল কর্তৃক মহাবোধি সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উক্ত সংগঠনের নেতৃত্বাধীনে ভারতে পুনরায় বুদ্ধধর্মের নবজাগরণ সূচিত হয়। যদিও সেই সময় মহাবোধি সোসাইটি মূলত উচ্চবর্ণীয় ব্যক্তিদের বুদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।
মূলত দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন বা নববৌদ্ধ আন্দোলন হল বিংশ শতাব্দীতে সিংহলি বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সহায়তায় ভারতের দলিতগণকে নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বৌদ্ধ নবজাগরণ। ভারতের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ভীমরাও আম্বেদকর বর্ণাশ্রমভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য হিন্দু-সমাজের নিন্দাপূর্বক সমস্ত দলিত অর্থাৎ শূদ্রাদি নিম্নবর্ণীয় ব্যক্তিগণকে বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত হতে আহ্বান করেন এবং এর ফলে এই আন্দোলন বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।
বুদ্ধধর্মে দীক্ষা গ্রহণ : নৃতত্তে¡র ছাত্র হিসেবে আম্বেদকর আবিষ্কার করেন মহরেরা আসলে প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। বুদ্ধধর্ম ত্যাগে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তাদেরকে গ্রামের বাইরে সমাজচ্যুতদের ন্যায় থাকতে বাধ্য করা হয়। অবশেষে তারাই অসপৃশ্যতে পরিণত হয়েছিলো। তিনি এ ব্যাপারে তাঁর পাÐিত্যপূর্ণ বই “কারা শুভ্র ছিল?” নামক বইতে বর্ণনা দেন। আম্বেদকর তাঁর সারাজীবন বুদ্ধধর্ম অধ্যয়ন করেন, ১৯৫০ সালে তিনি এ’ ধর্মে তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন এবং বৌদ্ধ পÐিতদের ও ভিক্ষুদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন (তারপর শিলং)। যখন তিনি পুনের কাছাকাছি একটি নতুন বৌদ্ধ বিহার অর্পণ করেন, তখন আম্বেদকর ঘোষণা দেন যে, তিনি বুদ্ধধর্মের উপর একটি বই লিখেছেন, যত শীঘ্রই সম্ভব তিনি বইটি শেষ করবেন; তিনি সাদামাটাভাবে এই ধর্ম গ্রহণ করবেন। আম্বেদকর ১৯৫৪ সালে দু’বার বার্মা সফর করেন, দ্বিতীয়বার অবশ্য রেঙ্গুগুনের বিশ্ব ৩য় বৌদ্ধ শিক্ষাবৃত্তি সম্মেলনে যোগদান করতে যান। ১৯৫৫ সালে তিনি ভারতীয় বৌদ্ধ মহাসভা (দ্য বুড্ডিস্ট সোসাইটি অব ইন্ডিয়া) গঠন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি তাঁর সর্বশেষ বই “বুদ্ধ ও তাঁর ধর্ম” (ঞযব ইঁফফযধ ধহফ ঐরং উযধসসধ)-এর কাজ শেষ করেন, যেটি তাঁর মরণোত্তর ছাপানো হয়। সভার পরে শ্রীলঙ্কার এক ভিক্ষু হামমালা সাদ্ধ্যতিষ্য, আম্বেদকর তাঁর নিজের ও অনুসারীদের জন্য নাগপুরে ১৪ অক্টোবর ১৯৫৬ সালে একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ঐতিহ্যবাহী প্রথায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছ থেকে ত্রিশরণ (ঞযৎবব জবভঁমবং) ও প শীল (ঋরাব চৎবপবঢ়ঃং) গ্রহণের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। এরপর প্রায় ৫ লাখ লোক তাঁর সাথে সেখানে বুদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তারপর নভেম্বর মাসে তিনি নেপালের কাঠমুন্ডুতে ৪র্থ বিশ্ব বৌদ্ধ সম্মেলনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পরবর্তীকালে বহু ধর্মান্তরিত দলিত নিজেদের “আম্বেদকর বৌদ্ধ” বলে অভিহিত করেছেন। কারণ আম্বেদকরের দীক্ষাগ্রহণের মাধ্যমেই এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ এই আন্দোলনকে নববৌদ্ধ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ এর ফলে ভারতে অবলুপ্তপ্রায় বুদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়েছিল।
তিনি “বুদ্ধ ও কার্ল মার্ক্স” এবং “বিপ্লব ও বিপ্লব-বিরোধী প্রাচীন ভারত” সমপর্কিত রচনা প্রকাশ করেন যা তাঁর বই “বুদ্ধ ও তাঁর ধর্ম” বুঝতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখে, যা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।
বৌদ্ধধর্ম প্রসারে আম্বেদকরের অবদান : ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ভারতের গরীব “মহর” (গধযধৎ) পরিবারে (তখন অস্পৃশ্য জাতি হিসেবে গণ্য হত) জন্মগ্রহণ করেন। আম্বেদকর সারাটা জীবন সামাজিক বৈষম্যতার (ঝড়পরধষ উরংপৎরসরহধঃরড়হ), “চতুর্র্বণ পদ্ধতি”-হিন্দু সমাজের চারটি বর্ণ এবং ভারতবর্ষের অসপৃশ্য (টহঃড়ঁপযধনষবং ড়ৎ টহঃড়ঁপযধনষবং পড়সসঁহরঃু) প্রথার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন। তিনি বুদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং হাজারো শত (ঐঁহফৎবফং ড়ভ ঞযড়ঁংধহফং) অসপৃশ্যদের থেরবাদী বুদ্ধধর্ম (ঞযবৎধাধফধ ইঁফফযরংস) স্ফুলিঙ্গের মতো রূপান্তরিত করে সম্মানিত হয়েছিলেন। আম্বেদকরকে ১৯৯০ সালে মরণোত্তর (চড়ংঃযঁসড়ঁং) “ভারত রতœ”-ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, ভারতের মহাবিদ্যালয় শিক্ষা অর্জনে আম্বেদকর প্রথম “সমাজচ্যুত ব্যক্তি” (ঙঁঃপধংঃ) হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। অবশেষে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয় (লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স) থেকে আইনে ডিগ্রি (বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ উপাধি) লাভ করার পর, আম্বেদকর বিদ্বান ব্যক্তি (ঝপযড়ষধৎ) হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং কিছু বছর তিনি আইন চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, পরে তিনি ভারতের অসপৃশ্যদের সামাজিক অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার উপর ওকালতির সময় সমসাময়িক সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন। কিছু ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাঁকে “বোধিসত্ত¡” উপাধিতে সম্মানিত করেন, যদিও তিনি নিজেকে “বোধিসত্ত¡” হিসেবে কখনো দাবি করেননি। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে য়েবলা (ণবাষধ -ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাশিক জেলার একটি শহর) সম্মেলনে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর ঘোষণা করেন যে, তিনি কিছুতেই একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে মৃত্যুবরণ করবেন না। কারণ হিন্দু ধর্ম বর্ণভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ এবং বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আম্বেদকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রত্যেকেই তাঁকে স্ব স্ব ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর বিভিন্ন বৈঠকে দলিতদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলো আলোচিত হয়। ১৯৩৬ সালের ২২ মে লক্ষ্ণৌতে একটি “সর্বধর্ম সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়। জগজীবন রাম সহ বহু বিশিষ্ট দলিত নেতৃবর্গ উক্ত সম্মেলনে যোগদান করেন, যদিও বাবাসাহেব আম্বেদকর এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এই সম্মেলনে ইসলাম, খ্রিষ্টান ধর্ম এবং বুদ্ধধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিগণ তাঁদের ধর্মের গুণাবলী দলিত নেতাদের সামনে ব্যাখ্যা করেন।
১০ জুন, ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ভিক্ষু লোকনাথ বাবাসাহেব আম্বেদকরের দাদরের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বুদ্ধধর্ম গ্রহণ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। পরে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লোকনাথ জানান যে আম্বেদকর বুদ্ধধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং সমগ্র দলিত সমপ্রদায়কে বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। ১৯৩৭ সালে লোকনাথ তাঁর সিংহলে অবস্থিত ছাপাখানা থেকে ভারতের নিপীড়িত এবং দলিত সমপ্রদায়ের উদ্দেশে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন যাতে লিখিত হয়-বুদ্ধধর্ম আপনাদের মুক্তি এনে দেবে।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমার্ধে আম্বেদকর একবার কানপুরে অবস্থিত আচার্য ঈশ্বরদত্ত মেধার্থীর বুদ্ধিপুরী বিদ্যালয়ে ভ্রমণ করেন। ইতঃপূর্বেই মেধার্থী ভিক্ষু লোকনাথ কর্তৃক বুদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং ১৯৪০ সালের মধ্যভাগে তাঁর আম্বেদকরের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। দিল্লিতে কিছুদিনের জন্য আম্বেদকরের আচার্য মেধার্থীর নিকটে পালি ভাষাও শিক্ষা করেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কোলহাপুরের মহারাজ চতুর্থ সাহু কর্তৃক আয়োজিত “অব্রাহ্মণ সম্মেলন”-এ আম্বেদকর প্রথমবার বোধানন্দ মহাস্থবিরের সাক্ষাৎপ্রাপ্ত হন। ১৯৪০ সালে পর পর দু’টি অনুষ্ঠানে তাঁরা পুনরায় সাক্ষাৎ করেন এবং ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করেন। মহাস্থবির আম্বেদকরের দ্বিতীয় বিবাহে আপত্তি প্রকাশ করেন। কারণ তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী ছিলেন ব্রাহ্মণ কুলজাতা। পরবর্তীকালে মহাস্থবিরের অনুগামীগণ আম্বেদকরের “রিপাবলিকান পার্টি” (জবঢ়ঁনষরপধহ চধৎঃু)- তে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
আম্বেদকর কর্তৃক গৃহীত ২২টি শপথ : স্বয়ং দীক্ষা গ্রহণের পর আম্বেদকর তাঁর অনুগামীগণকে দীক্ষা প্রদান করেন। ত্রিরতœ এবং প শীল গ্রহণের পর তাঁরা সম্মিলিতভাবে ২২টি শপথ গ্রহণ করেন। এরপর ১৬ অক্টোবর ১৯৫৬ তারিখে আম্বেদকর অপর একটি গণদীক্ষার আয়োজন করেন এবং সেখানেও নবদীক্ষিত বৌদ্ধগণ নিম্নলিখিত ২২টি শপথ প্রদান করেন।
১. আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের উপাসনা করব না।
২. আমি রাম এবং কৃষ্ণ, যারা ঈশ্বরের অবতার রূপে পরিচিত, তাদের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের উপাসনা থেকে বিরত থাকব।
৩. আমি গৌরী, গণপতিসহ অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীগণের প্রতি কোন বিশ্বাস রাখব না এবং তাদের আরাধনা করব না।
৪. আমি ঈশ্বরের অবতারে বিশ্বাস করি না।
৫. আমি ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে স্বীকার করি না এবং ভবিষ্যতেও করব না। আমি মনে করি এ তত্ত¡টি একটি মিথ্যা প্রচারমাত্র।
৬. আমি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এবং মৃতের উদ্দেশে পিন্ডদান করা থেকে বিরত থাকব।
৭. আমি সে-সমস্ত কার্যাবলি থেকে বিরত থাকব যার দ্বারা ভগবান বুদ্ধের শিক্ষার অবমাননা হয়।
৮. আমি ব্রাহ্মণগণকে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে ধর্মীয় ক্রিয়াদি সমপাদন করতে দেব না।
৯. আমি মানুষের মধ্যে সাম্যে এবং ঐক্যে বিশ্বাস করব।
১০. আমি মানবসমাজে সাম্য এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠার্থে আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে যাব।
১১. আমি ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুসরণ করে চলব।
১২. আমি ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত দশ পারমিতা মান্য করে চলব।
১৩. আমি জগতের সকল জীবের প্রতি দয়া এবং করুণা প্রদর্শন করব এবং তাদের রক্ষা করব।
১৪. আমি চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করব না।
১৫. আমি মিথ্যা বাক্য উচ্চারণ করব না এবং কখনও মিথ্যাচার করব না।
১৬. আমি ইন্দ্রিয়কাম চরিতার্থ করার জন্য কোন অসাধু কার্যে লিপ্ত হব না।
১৭. আমি মদ্যাদি মাদকদ্রব্য সেবন করব না।
১৮. আমি জীবনে প্রতিনিয়ত অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুশীলনের প্রয়াস করব এবং সকলের প্রতি করুণা অভ্যাস করব।
১৯. আমি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করছি কারণ হিন্দুধর্ম মনুষ্যত্বের পক্ষে ক্ষতিকর। হিন্দুধর্ম বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানবসমাজে বিভেদের প্রাচীর সৃষ্টি করেছে এবং সাম্য প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করেছে। তাই আমি বুদ্ধধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার ধর্ম হিসেবে অবলম্বন করলাম।
২০. আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম।
২১. আমি বিশ্বাস করি যে আমি জন্মান্তরিত হয়েছি।
২২. আমি এতদ্বারা ঘোষণা করছি যে আমি ভবিষ্যতে ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম দর্শন এবং শিক্ষানুসারে জীবনযাপন করব।
একনজরে ভীমরাও রামজি আম্বেদকর : ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ছিলেন একজন ভারতীয় ব্যবহারশাস্ত্রজ্ঞ (জ্যুরিস্ট), রাজনৈতিক নেতা, বৌদ্ধ আন্দোলনকারী, দার্শনিক, চিন্তাাবিদ, নৃতত্ত্ববিদ (অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মরংঃ), ঐতিহাসিক, বাগ্মী, বিশিষ্ট লেখক, অর্থনীতিবিদ, পÐিত, সমপাদক, রাষ্ট্রবিপ্লবী ও বৌদ্ধ পুনর্জাগরণবাদী। তিনি বাবাসাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ভারতের সংবিধানের খসড়া কার্যনির্বাহক সমিতির সভাপতিও ছিলেন। তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী এবং ভারতের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। ইনি ভারতের সংবিধানের মুখ্য স্থাপক।
ডাক নাম : বাবা, বাবা সাহেব, বোধিসত্ত¡, ভীমা, মুখ্যনায়ক, আধুনিক বুদ্ধ।
জন্মস্থান : মোহ (গযড়)ি, কেন্দ্রীয় প্রদেশ, (এখন মধ্যপ্রদেশ), ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যুস্থান : দিল্লি, ভারত
জীবনকাল : ১৪ এপ্রিল ১৮৯১ হতে ৬ ডিসেম্বর ১৯৫৬ (৬৫ বছর)
জাতীয়তা : ভারতীয়
উপাধি : ভারতের আইন-মন্ত্রী, চেয়ারম্যান অব দ্যা কন্স্টিটিউশন ড্রাফটিং কমিটি।
আন্দোলন : দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন
প্রধান সংগঠন : সমথ সৈনিক দল, তফসীল সমপ্রদায়, স্বনির্ভর শ্রমিক দল (ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি (ভারত), পূর্বেকার অসপৃশ্য জাতি সিডিউল কাস্টেস ফেডারেশন, জবঢ়ঁনষরপধহ চধৎঃু ড়ভ ওহফরধ, বুডিস্ট সোসাইটি অব ইন্ডিয়া (ভারতীয় বৌদ্ধ সঙ্ঘ)।
রাজনৈতিক দল : প্রজাতান্ত্রিক দল (ভারত)
পুরষ্কার : ভারতরতœ (১৯৯০ সাল)
ধর্ম : বুদ্ধধর্ম
দামপত্য সঙ্গী : রামাবাই (বিয়ে ১৯০৬ সাল) ও সভিতা (১৯৪৮ সাল)
শিক্ষা : এম.এ. (গ.অ.); পি.এইচ.ডি. (চযউ.); ডি.এস-সি. (উ.ঝপ.); এল.এল.ডি.(খ.খ.উ.); ডি.লিট. (উ.খরঃ.); ব্যারিস্টার (আইন) ইধৎৎরংঃবৎ (খধ)ি
শিক্ষাক্ষেত্র : ইউনিভার্সিটি অব মুম্বাই, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, লন্ডন ইউনিভার্সিটি।
মহাপ্রয়াণ : ১৯৪৮ সালে আম্বেদকর ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। শারীরিক অবনতির জন্য ১৯৫৪ সালের জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তিনি শয্যাগত ছিলেন ও দৃষ্টিশক্তি হারান। রাজনৈতিক কারণে তিনি ক্রমশ অনেক তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠেন, যা তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৫ সালের পুরো সময় জুড়ে প্রচন্ডভাবে কাজ করার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অধিকতর অবনতি হয়। টানা তিন দিন “বুদ্ধ ও তাঁর ধর্ম” বইটির সর্বশেষ পান্ডুলিপি তৈরির পর বলা হয় যে, তিনি ৬ ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে তাঁর নিজ বাড়ি দিল্লিতে ঘুমন্ত অবস্থায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
[লেখক : ভদন্ত বোধিরত্ন ভিক্ষু, এমফিল গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা। ]

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!