সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১০:২৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের

অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের


ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া:

সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার নাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশে বসবাসরত বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু। আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ মনীষা, মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি এবং ঢাকার সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মহাধ্যক্ষও ছিলেন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহু সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ছিলেন মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরর সুযোগ্য শিষ্য। তাঁর সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায় নয়, সমগ্র দেশের মানুষের জন্য সম্মান, কল্যাণ ও মঙ্গলজনক ছিল।

তিনি গত ৩ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকার ধানমণ্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালে ৮৮ বছর বয়সে সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের মানুষ শুধু একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হারায়নি, হারিয়েছে একজন মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুকে। তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁকে হারিয়ে এ দেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই আজ শোকাহত। ব্যথায় ব্যথিত।

পৃথিবীতে কালে কালে ধর্মীয় প্রবক্তাদের আগমনে পৃথিবী সুখময়, শান্তিময় সর্বোপরি স্বস্তিময় হয়ে ওঠে। তাঁদের নিরলস শ্রম, মেধা, সেবায় সমাজ এগিয়েছে বহুদূর আর বিকশিত হয়েছে সভ্যতা-কৃষ্টি। এমনকি মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন-ঐক্য সুদৃঢ়করণে তথা মৈত্রী সুপ্রতিষ্ঠিতকরণে তাঁদের রয়েছে অনন্যসাধারণ অবদান। এ দেশে যে কজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আগমন হয় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

তিনি ছিলেন সেবাপরায়ণ ও অতিথিপরায়ণ। তিনি নিজের মধ্যে অন্যকে দেখতে পেতেন। তাই তো পরোপকারী একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েও তিনি সমাজের সব ধর্মের সর্বস্তরের মানুষের কথা ভাবতেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারে, সামাজিক দুর্যোগ মোকাবেলায়, পরিবেশ সংরক্ষণে এবং আর্তমানবতার সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত করে রাখতেন। কবির ভাষায়, তাঁর সমাজ উন্নয়ন-নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের দর্শন হলো :

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

এ জীবন মন সকলি দাও,

তার মত সুখ কোথাও কি আছে?

আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

উপরোক্ত আদর্শের গভীরে নিহিত রয়েছে ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সর্বজনীন প্রেম। তিনি এরূপ আদর্শকে অন্তরে লালন করে আজীবন নিজেকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করে আর্তমানবতার সেবা করে গেছেন। সৃষ্টি ও সেবা করা যেন তাঁর ধর্ম ও কর্ম। আর্তপীড়িতের সেবা, মানবকল্যাণ ও জ্ঞান বিতরণই তাঁর একমাত্র ব্রত এবং ধ্যান-জ্ঞান। শিক্ষা বিস্তারে তিনি একে একে তৈরি করেন পদুয়ার ডিগ্রি কলেজ, পদুয়া বালিকা বিদ্যালয়, অগ্রসার বালিকা বিদ্যালয়, করল বালিকা বিদ্যালয়, ধর্মরাজিক উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তিনি অগণিত এতিমের অভিভাবক আর আর্তপীড়িতের একমাত্র বন্ধু। পূর্ণিমা, ঈদ ও পূজায় তাঁর অসাম্প্রদায়িক বিচরণ ছিল সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিবছর রোজার সময় তিনি ইফতার বিতরণ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা সবাইকে সম্প্রীতি-সদ্ভাব সংরক্ষণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করতেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিহারটির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি অসীম সাহসী যেমন ছিলেন, তেমনি আবার মানবিকও ছিলেন বটে। মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবনযাপন আতঙ্কময় ছিল। এ সময় তিনি অসম সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী পীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। মানবিকতায় নিজেকে পরার্থে উৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি অতি সতর্কতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষা করেন। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।

সম্প্রীতি-সদ্ভাব সমৃদ্ধিকরণে কিংবা আন্তর্ধর্মীয় সংহতি রক্ষায় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সম্প্রীতির বলিষ্ঠ সেনাপতি একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু, যাঁর খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাকরণেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাশীলতা, প্রজ্ঞা ও মননশীলতা সবাইকে আকৃষ্ট করে। এ অবস্থায় তাঁর কর্মকীর্তির জন্য তিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম একজন শান্তির দূত।

তিনি ছিলেন সাংগঠনিক ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ত্রিকালের সাক্ষী তিনি, ত্রিকালকে ধারণ করেন আপন মহিমায়। ত্রিকালের কর্ম-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর সৃষ্টি। সৃজনশীলতার সাধনায় আত্মমগ্ন এই ঋদ্ধ পুরুষ বহুগুণে গুণান্বিত। তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্যা পালনকারী লোভ-দ্বেষ-মোহহীন এবং নিরহংকারী একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা, স্মারক ও পদকে ভূষিত হন। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তিনি ২০১২ সালে একুশের পদকে ভূষিত হন।

তিনি মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষার আদর্শে বলীয়ান হয়ে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। গুণীর প্রতি শ্রদ্ধা, গুরুজনের প্রতি ভক্তি, অপরের গুণের স্বীকৃতি, অন্যের প্রতিভাকে মূল্যায়ন করে তিনি প্রতিভাবানদের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করে গেছেন তা অকল্পনীয়। শান্তির বাণী নিয়ে তিনি ভ্রমণ করেন চীন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, ভারত, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, হংকং, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ ৮০টি দেশ। তা ছাড়া শতাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কর্মবহুল জীবন তাঁকে উপনীত করেছে বৌদ্ধ সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু সংঘনায়কের আসনে। শৈশবে মাতা-পিতা হারানো প্রতিভাদীপ্ত কর্মযোগী মহাপুরুষের সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উত্তর পদুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে ১৯৩৩ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বঙ্গচন্দ্র বড়ুয়া এবং মাতার নাম রেবতী বালা বড়ুয়া। কালপরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ববরেণ্য মানবতাবাদী বৌদ্ধ সাংঘিক ব্যক্তিত্ব। সব শেষে বলি—

‘নয়ন সম্মুখে তুমি নাই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’

লেখক : অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান-পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সদস্য—সম্প্রীতি বাংলাদেশ

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!