রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম মেদিনীপুর মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম মেদিনীপুর মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার


রত্না ভট্টাচার্য্য, শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য:

মোগলমারি হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত একটি গ্রাম ও পুরাতাত্ত্বিক খনন কেন্দ্র। দাঁতন থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে মোগলমারি নামে এক গ্রাম আছে। প্রথমেই আসা যাক গ্রামনামের উৎস সম্পর্কে। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ মোগল বাদশাহ আকবরের ফৌজ নিয়ে এখানেই এসেছিলেন রাজা টোডরমল্ল। টোডরমল্লের সঙ্গে সোলেমান কররানির পুত্র দাউদ শাহের ভয়ানক যুদ্ধ হয়। সেই রক্তাক্ত সংগ্রামে দাউদ শাহ পরাজিত হলেও প্রচুর সংখ্যক মোগল সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। সেই থেকে এই গ্রামের নাম হয় মোগলমারি।

এখন মোগলমারি আর ততটা অপরিচিত নাম নয়, উপরন্তু গ্রামটি বর্তমানে পত্র-পত্রিকার দৌলতে প্রচারের আলোয় আলোকিত। গ্রামটিতে প্রবেশ করতে গেলে সামনেই পড়ে ইটের গাঁথনিযুক্ত মাটির ঢিবি বা স্তূপ। এটি আসলে বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপ। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে তাম্রলিপ্ত বন্দরকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। মোগলমারিতে তৈরি হয়েছিল এক বিরাট বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান। হঠাৎই অন্য একটি সংস্কৃতির আঁচ এসে পড়াতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বৌদ্ধবিহার আক্রমণের আশঙ্কায় বিহারের মধ্যে একটি ঘরের মেঝে খুঁড়ে তার মধ্যে বৌদ্ধ দেবদেবীর ধাতুর তৈরি প্রায় ৫০টি মূর্তি রেখে গর্ত বুজিয়ে দিয়েছিলেন।

এই স্তূপের খননকার্য শুরু হয় ২০০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে। মাঝে কিছু দিন বন্ধ ছিল। ২০১৩ থেকে এই কাজের সামগ্রিক দায়িত্ব বর্তায় রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধীন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাঁধে। এখনও পর্যন্ত এই বৌদ্ধবিহার থেকে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির কিছু সিলমোহর, মাটির তৈরি আতরদান, নকশা করা ইট, মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের বাটি, নলযুক্ত পাত্রের ভগ্নাবশেষ ইত্যাদি। এগুলি রাখা আছে খননকার্যের পাশেই এক মিউজিয়ামে। সেটি তালাবন্ধই থাকে। চাবি থাকে গ্রামবাসীদের কাছে। ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজ্য পুরাতত্ত্ব দপ্তর উদ্ধার করেছে সেই ৫০টি মূর্তি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ৪৩ সেন্টিমিটার লম্বা অবলোকিতেশ্বেরর একটি মূর্তি। অন্যগুলি ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। তার কোনওটা হারীতী, কোনওটি তারা, কোনওটি সরস্বতী বলে পুরাতত্ত্ববিদরা অনুমান করছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই মূর্তিগুলি সামনে রেখে বিহারে ধ্যান করা হত। আশার কথা যে, মূর্তিগুলির উপর সবুজ আস্তরণ পড়ে গেলেও খুব যত্নের সঙ্গে পুরাতত্ত্ববিদরা মাটি কেটে আস্তে আস্তে বার করছেন বলেই মূর্তিগুলি অটুট আছে। এই সব মূর্তি প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে ওই সময়ে বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি জোয়ার এসেছিল এবং দাঁতনের মোগলমারির এই প্রতিষ্ঠানটি তারই অঙ্গ।
মোগলমারির কাছাকাছি স্থানে একটি ইটের স্তূপ আজও পড়ে আছে, যেটি শশীসেনার পাঠশালা বা সখীসেনার ঢিবি নামে পরিচিত। জনশ্রুতি, এই স্থানে রাজা বিক্রমকেশরীর বিদূষী কন্যা শশীসেনার সঙ্গে রাজার কোটালের ছেলে অহিমানিকের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তারা একই গুরুর কাছে পাঠাভ্যাস করতেন। উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাদের এই প্রণয়কথা বিবৃত আছে কবি ফকিররামের ‘সখী সোনা’ কাব্যে।

দাঠাবংশ’ নামক বৌদ্ধগ্রন্থ থেকে যে মতটি উঠে আসে, তা হল-– বুদ্ধশিষ্য ক্ষেমের কাছ থেকে বুদ্ধদন্ত উপহার লাভ করে (দন্তটি ক্ষেম সংগ্রহ করেন বুদ্ধের চিতা থেকে) কলিঙ্গরাজ ব্রহ্মদত্ত এক দন্তমন্দির নির্মাণ করেন এবং স্থানটির নাম দেন দন্তপুর। সেই দন্তপুরই কি এই দাঁতন? মনে প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক। দাঁতনের কাছে মোগলমারির বৌদ্ধবিহারটি আবিষ্কৃত হবার পরে এটা মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক যে, এই দাঁতনই অতীতের প্রাচীন দন্তপুর। ক্রমে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রভাব বিস্তার করলে এখানকার দন্তমন্দির থেকে বুদ্ধদন্ত নিয়ে ওড়িশার রাজকন্যা হেমলতা ও জামাতা সুদন্ত বণিকের ছদ্মবেশে তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে জাহাজে করে সিংহল অর্থাৎ বর্তমান শ্রীলঙ্কায় পৌঁছন, সেখানকার রাজার নিরাপদ আশ্রয়ে। তৎকালীন সিংহলরাজ মেঘবাহন পরমশ্রদ্ধায় ধর্মমন্দিরে দন্তটির প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে বুদ্ধদন্ত নিত্য পূজিত হচ্ছে।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!