সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
বুদ্ধগয়ার বোধি বৃক্ষ

বুদ্ধগয়ার বোধি বৃক্ষ


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু:

পালি ত্রিপিটকের ‘বুদ্ধবংশ’ গ্রন্থানুসারে রাজকুমার সিদ্ধার্থ যখন ৫৬৩ খৃষ্ট পূর্বাব্দে লুম্বীনি উদ্যানে জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁর সাথে আরও সাতজনের জন্ম হয়। তাঁরা হলেন বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ ভন্তে, সিদ্ধার্থের বাল্যবন্ধু কালুদায়ী, অশ্ব কণ্ঠক (যে অশ্বের পীঠে ছড়ে তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন), রথের সারথী ছন্দক, সিদ্ধার্থের স্ত্রী গোপা বা যশোধরা, কপিলবাস্তুর রাজপ্রাসাদের চার কোণায় চারটি নিধিকুম্ভ ও গয়ার বোধিবৃক্ষ। এদেরকে সপ্তসহজাত বলা হয়। লুম্বিনীতে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম হলে তৎক্ষণে গয়াতে এ অশ্বত্থ বা বোধিবৃক্ষেরও অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল।

এ বৃক্ষের নীচে বা ছায়াতলে বসে রাজ সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থ সাধনা করে বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন বলে এ বৃক্ষকে বৌদ্ধরা গৌরব করে অশ্বত্থ বৃক্ষ না বলে বোধি বা জ্ঞানবৃক্ষরূপে আখ্যায়িত করেছে।

বুদ্ধ তিন প্রকারের চৈত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল পারিভৌগিক চৈত্য, উদ্দেশিক চৈত্য ও শারীরিক চৈত্য। বুদ্ধের দেহাবশেষকে শারীরিক চৈত্য বলা হয়। বুদ্ধের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্তুপাদিকে উদ্দেশিক চৈত্য বলা হয়। যে বস্তু সমূহ বুদ্ধ তাঁর জীবনে ব্যবহার করেছেন সেগুলোকে পারিভৌগিক চৈত্যরূপে পরিগণিত হয়। বোধিবৃক্ষের ছায়া, অক্সিজেন গ্রহণ করে তথাগত ধ্যান করে বুদ্ধত্বজ্ঞান লাভ করেছেন বলে বোধিবৃক্ষ পারিভৌগিক চৈত্যরূপে অভিহিত হয়। যাঁরা শ্রদ্ধার সাথে বোধিবৃক্ষকে দর্শন, বুদ্ধগয়া মহাবোধি চৈত্য দর্শন ও বুদ্ধের ধাতু দর্শন করবেন তাঁরা জীবিত বুদ্ধকে দর্শনের মত পুণ্য লাভ করবেন।

বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তথাগত বুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পুরা সাতদিন দাঁড়িয়ে বোধিবৃক্ষের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে বোধি বৃক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন এ বৃক্ষ তাঁকে ছায়া ও অক্সিজেন দান করেছিলেন বলে। একটা বৃক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন পৃথিবীর ইতিহাসে ইহা একটি বিরল ঘটনা। এ উদাহরণ প্রমাণ করে বুদ্ধ একজন কত কৃতজ্ঞতাবোধ সম্পন্ন মহাপুরুষ যিনি একটি বৃক্ষের উপকারও অকপটে স্বীকার করেছেন। ইহাকে অনেকে ‘ ইমেহেতে মহাবোধি লোকনাথেন পূজিতা’ বলে উল্লেখ করে বোধিবৃক্ষকে সপ্তাহ পর্যন্ত পূজা করেছেন বলেছেন। কিন্তু সে ধারণা খুবই ভুল। বুদ্ধ কখনও কাউকে পূজা করেননি। চক্রবালে বুদ্ধের পূজ্য কেহ নাই। বুদ্ধ নিজেও বলেছিলেন-‘ ন মে আচারিযো অত্থি, সদিসো মে ন বিজ্জতি’ অর্থাৎ আমার কোন আচার্য বা শিক্ষক নাই, আমার সদৃশও কেহ নাই’। তাহলে কি করে একটা বৃক্ষ বুদ্ধের পূজ্য হতে পারে? ইহা ভক্তির আতিশয্যে সিংহলী ভক্তেরা অন্ধভক্তিতে গদ গদ হয়ে এভাবে রচনা করেছেন। যা মারাত্মক ভুল। বুদ্ধ সাতদিন পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এ মহাবোধি বৃক্ষকে। কৃতজ্ঞতা ও পূজা এক নয়। এ জন্য আমি বোধি বন্দনায় ‘পূজিতা’র স্থলে ‘কতঙুতা’ লিখেছি।

বুদ্ধগয়ার ধরণীতে ধম্ম তরঙ্গকে পল্লবিত করতে বোধি বৃক্ষ এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

তথাগত বুদ্ধ সে স্থানেই যেখানে আজও বজ্রাসন বিরাজমান আছে তথায় সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত করেছিলেন। সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত করে তথাগত বোধিবৃক্ষের নীচে ছায়াতলে বজ্রাসনে বসে এক সপ্তাহ পর্য্যন্ত সম্বোধি জ্ঞানের অপরিমিত সুখ অনুভব করেছিলেন। দ্বিতীয় সপ্তাহ অনিমেষ লোচনে বোধিবৃক্ষের দিকে দাঁড়িয়ে অপলক নেত্রে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। যে কারণে আমরা বোধি বৃক্ষকে সর্বদা বন্দনা করি।

তিনি যে বৃক্ষের নীচে বসে সাধনা করে সম্বোধি লাভ করেন তা হল অশ্বত্থ বা পিপল বৃক্ষ। তথাগতের জ্ঞান বা বোধি লাভের কারণে এ পিপল বৃক্ষকে আমরা বোধি বৃক্ষ বলে থাকি। বর্তমানে বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মহাবিহারের পশ্চাতে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষ হল মূল বোধিবৃক্ষের চতুর্থ বংশধর।

মূল বোধি বৃক্ষের পূজা- বন্দনা করার পরে মহান সম্রাট অশোক খ্রীষ্ট পূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে এ মহাবোধি চৈত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। এখনও এ মহাবিহার সম্রাট অশোকেরই মহান স্মৃতি বহন করে। কলিঙ্গ যুদ্ধ বিজয় করে শান্তির অন্বেষার সম্রাট অশোক বুদ্ধের শরণাপন্ন হন। তিনি শান্তির খোঁজে প্রায়ই বোধি বৃক্ষের নীচে এসে ধ্যান মগ্ন থাকতেন। ইহা তাঁর দ্বিতীয় রাণী তিষ্যরক্ষিতার পছন্দ হত না। কারণ তিনি বুদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন বলে উল্লিখিত আছে। একারণে রাণী তিষ্যরক্ষিতা কর্তৃক বোধিবৃক্ষ কর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু শিখর জীবিত থাকার কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পুন পল্লবিত হয়ে মহীরূহ আকার ধারণ করে। সে বার প্রায় ৮০০ বছর পর্যন্ত বৃক্ষ বিরাজমান ছিল। এ দ্বিতীয় বংশের বৃক্ষটিকে বাংলার বৌদ্ধ বিদ্বেষী রাজা শশাঙ্ক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করতে গিয়ে আগুনে পুড়িয়েছিলেন।

এ আগুনে জ্বলা বৃক্ষটির শিখর হতে পুনরায় অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল। ইহাকে তৃতীয় বংশধর বলা হয়। এ তৃতীয় বংশধরের বৃক্ষটি প্রায় ১২৫০ বছর পর্য্যন্ত জীবিত ছিল। ১৮৭৬ সালে উত্তর পুর্ব ভারতে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগরূপ ঝড় তুফানের কবলিত হলে তৃতীয় প্রজন্মের এ বোধিবৃক্ষটি সমূলে ধরাশায়ী হয়ে যায়। ইহাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ Sir Lord Alexander Cunningham ১৮৮১ সালে শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুর হতে মুল বোধি বৃক্ষের চারা এনে এখানে রোপন করেন। ইহা হল মুল বৃক্ষের চতুর্থ বংশধর। তবে মুল বৃক্ষের শাখা বলে আমরা ইহাকেও মুল বৃক্ষ বলে ধরে নিতে পারি। ইহা মুল বৃক্ষ হতে ভিন্ন কোন বৃক্ষ নয়।

মহান সম্রাট অশোকের কন্যা রাজকুমারী সংঘমিত্রা, যিনি ভিক্ষুণী হয়ে বুদ্ধগয়া হতে বোধিবৃক্ষের শাখা নিয়ে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন রাজধানী অনুরাধাপুরে রোপন করিয়েছিলেন, সে বোধিবৃক্ষ এখন তথায় জীবন্ত বিদ্যমান রয়েছে। এবং ইহার ঐতিহাসিক রেকর্ড সুরক্ষিত রয়েছে। ২০০৭ সালে বুদ্ধগয়া স্থিত বোধিবৃক্ষের DNA টেষ্ট হয়েছে। তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, বুদ্ধগয়ার মহাবোধিবৃক্ষ শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরের শ্রীমহাবোধিবৃক্ষেরই অংশ। এ জয়শ্রী মহাবোধিবৃক্ষ থেকে উৎপন্ন অন্য বোধিবৃক্ষ মহত্বপূর্ণ বৌদ্ধস্থানে আজ আমরা দেখতে পাই।

বোধিবৃক্ষ দেখা মাত্রই বুদ্ধের অনুগামীদের নিকট ধর্ম সংবেগ উৎপন্ন হয় এবং শ্রদ্ধাপূর্বক তাঁরা বন্দনা করে থাকেন এ বলে- অহম্পি তে নমস্সামি বোধিরাজা নমত্থুতে।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!