রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১০:১২ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বর

বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বর


নশ্বর সুজয়: 

বুদ্ধ দর্শন মতে, ঈশ্বর বলতে কিছুই নাই। কেননা ঈশ্বর যদি বিশ্বব্রম্মান্ড সৃষ্টি করেন, তবে তার একটা উদ্দেশ্য থাকবে। উদ্দেশ্য থাকলে তার তৃষ্ণা বা বাসনা থাকবে। তৃষ্ণার একান্ত কারন লোভ। ফলে ঈশ্বর তার সংজ্ঞা হারায়!
সিদ্ধর্ান্ত বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম যে উদান গাথা ভাষণ করেন তাতে তিনি স্পষ্ট সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের অস্থিত্বকে অস্বীকার করেছেন-
অনেক জাতি সংসারং- সন্ধাবিসসং অনিব্বিসং,
গহকারকং গবেসন্তো- দুক্ খা জাতি পুনপ্পুনং,
গহকারক দিট্’ঠোসি পুসগেহংন কাহসি
সব্বাতো ফাসুকা ভগ্’গা গহকুটচি সংখিতং
বিসংখারং গতংসিত্তং, তনহানং খয়মজ্জগা,
অথাৎ –
জন্ম জন্মান্তর পথে ঘুরেছি পাইনি সন্ধান
সে কোথা লুকিয়ে আছে, যে এ গৃহ করেছে নির্মাণ
পুনঃ পুনঃ দুঃখ পেয়ে দেখা তব পেয়েছি এবার
হে গৃহকারক গৃহ রচিতে পারিবে না আর,
চুরমার করেছি স্তম্ভ গৃহ ভিত্তিচয়,
সংস্কার বিগত চিত্ত, তৃঞ্চা আজি পেয়েছে ক্ষয় ।

পরিনির্বাণ শয্যায় শায়িত মুহুর্তেও বুদ্ধের অন্তিম বাণী ছিল ঠিক এরকম – “হন্দদানি ভিক্খবে আমন্তযামি বো বযধম্মা সঙ্খারা
অপ্পমাদেন সম্পাদেথা’তি।” অর্থাৎ ভিক্ষুগণ, তোমাদেরকে সম্বোধন করে বলছি যে, সংস্কার মাত্রই ধ্বংসশীল, অপ্রমাদের সাথে সর্বকার্য সম্পাদন কর।
কই এখানে তো বুদ্ধ ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার কোনো গুণগান করেন নি।

এছাড়াও বুদ্ধের দেশনায় দেখতে পাই –

অস্মিন্ সতি ইদং ভবতি’-(মজ্ঝিমনিকায়-১/৪/৮)
অর্থাৎ : ‘এটি ঘটবার পর ওটি ঘটছে’।
( প্রতিত্যসমুদ্পাদ )

প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তির পেছনে নানা হেতুর সমাবেশ রয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্ম সংযোগে উৎপন্ন হয়। সেকারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মূলমন্ত্রভাবে গৃহীত একটি সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে- ‘যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুন্তেষাং তথাগতঃ।
ঘ্যবদত্তেষাঞ্চ যো নিরোধ এবংবাদী মহাশ্রমণঃ।।’ ইতি।
অর্থাৎ : ধর্মসমূহ হচ্ছে হেতুপ্রভব। তথাগত বা বুদ্ধ তাদের হেতু ও নিরোধোপায় নির্দেশ করেছেন।

ইদানীং বাংলাদেশের কিছু নব্য পণ্ডিতেরা সৃষ্টি বা জন্মতত্ত্ব নিয়ে একেবারে উঠে পরে লেগেছে। ভাব দেখে মনে হয় বুদ্ধের ত্রিপিটক এদের কাছে তুচ্ছ। বুদ্ধের সিদ্ধর্ান্ত অনুপযোগ্য। সতি্য কথা হলো এরা বুদ্ধের দর্শন সম্পর্কের নুন্যতম ধারণাও রাখে না। না আছে পালি বা সংস্কৃতি জ্ঞান। আর এরা যাদের কাছে তার্কিকত্বের বাহার প্রদর্শন করে তাদের সিংহভাগই জ্ঞান প্রতিবন্ধি। যাই হোক।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বৌদ্ধরা যদি পুনজন্ম বিশ্বাস করে তাহলে জন্মচক্রে প্রবেশের পূর্বে সত্ত্বার বা প্রাণীর অবস্থান কেমন ছিল। ভবচক্রে সর্বপ্রথম সে আসল কি ভাবে। আদিতে এই সত্ত্বার কিরূপ স্বরূপ ছিল। ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এসেই যায়। আবার অন্যদিকে যারা ঈশ্বরের বিশ্বাসী, প্রভু বা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা জটপট করে উত্তর করেন- আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এখন যদি তাকে আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হয় ; ঈশ্বর গড প্রভু ভগবান্কে কে সৃষ্টি করল। এর উত্তরেও আপনি সন্তুষ্ট হতে পারবেন না প্রকৃত পক্ষে। সবদিকেই কিন্তু, কেন, এরূপ চলতেই থাকবে।

বুদ্ধের সমকালীন সময়েও বুদ্ধকে এরূপ উভয়কটিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ত্রিবেদজ্ঞ চতুরবেদজ্ঞ ব্রাম্মণরাই বুদ্ধের সাথে এরূপ তার্কিক যুদ্ধে আগ্রহী হতেন। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রে তা পরিলক্ষিত হয়।

জগত – সৃষ্টি – জন্মতত্ত্ব বিষয়ে বুদ্ধের কেমন বিচার ধারণা বা সিদ্ধান্ত ছিল তা জানতে হলে আপনাকে আমার পূর্বের পোষ্টটি অবশ্যই পাঠ করতে হবে। লিংকটি এখানে দেওয়া হল- https://www.facebook.com/sujay.barua.92/posts/678170539003602

এছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম মতে, অন্যান্য ধর্মের god অর্থাৎ generator, operator, destructor। অর্থাৎ ঈশ্বর এই কাজ করে থাকে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর নাই। তাই এই কাজগুলো কিভাবে সংঘটিত হবে? তাদের মতে এগুলো স্বয়ংক্রিয় একটি ‘নির্ভরশীলতা বা আপেক্ষিক’ একটি
পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। এই
স্বয়ংক্রিয় পদ্বতিকে ‘বিশ্বজনীন
নীতি’ বা ‘Cosmological Laws’ বলা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে যদি সৃষ্টিকর্তা,
ধ্বংসকর্তা, পরিচালনকর্তা রূপে কাউকে বসানো একান্ত প্রয়োজন হয়
তাহলে এই নীতি বসান যায়। সেই
স্বয়ংক্রিয় নীতি সমূহ কি? যেগুলোর
দ্বারা আমাদের সৃষ্টি হয়, পরিচালন হয়, ধ্বংস হয়? এগুলো হচ্ছে-
ক. ঋতু নিয়ম (Rules of Physics or matter)
খ. চিত্ত নিয়ম (Rules of Mind or citta)
গ. বীজ নিয়ম (Rules of Germinal order)
ঘ. কর্ম নিয়ম (Rules of Karma ) এবং
ঙ. ধর্ম নিয়ম ( Rules of Dharma)।

এই পঞ্চনিয়ম একটি অপরটির উপর
নির্ভর করে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়তঃ
তৈরি করছে, পরিচালন করছে, ধ্বংস
করছে। যদিও বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর বলতে
কিছুই নাই তথাপি যদি সৃষ্টিকারী,
ধ্বংসকারী এবং পরিচালনকারী কোন
কিছুকে ধরে নেওয়া হয় তবে বৌদ্ধ
ধর্মে এই পঞ্চনিয়মই হচ্ছে তা।
Ven. S. Dhammika তার good question good answer গ্রন্থে চমকপ্রদ আলোকপাত করেছেন।
এ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান এবং বুদ্ধের ব্যাখ্যা অভিন্ন। “অগ্গঞা সূত্রে” বুদ্ধের ব্যাখ্যা হলো, লক্ষ লক্ষ বছরের দীর্ঘ সময় ব্যাপী প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় সৌরমন্ডল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় সৌরমন্ডলের বর্তমান ঘূর্ণায়মান অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বপ্রকৃতির প্রথম প্রাণীর সৃষ্টি হয় জলে, এককোষী প্রাণী হিসেবে। পরবর্তী পর্যায়ে বিবর্তনের মাধ্যমে এককোষী প্রাণী বহুকোষী যৌগিক প্রাণীতে রুপান্তরীত হয়। প্রাকৃতিক কার্য-কারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রুপান্তর ঘটেছে, যা বুদ্ধের “প্রতীত্য সমুৎপাদ সূত্রে”ও দেশিত হয়েছে।
আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমরা মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষ মূল্যবান এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে অনন্ত মেধা সুপ্ত আছে। কর্মসাধনায় প্রতিটি মানুষ বুদ্ধের মত প্রজ্ঞা লাভ করে কোন বিষয় আসলে যে রকম ঠিক সেই রকম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি, মনের ঈর্ষা, ক্রোধ ও ঘৃণার স্থলে করুণা, ক্ষমা ও মৈত্রীর অনূভূতিতে উজ্জিবীত হয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ জ্ঞানশক্তির সাহায্যে জীবন জগতের সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বুদ্ধ বলেছেন আমাদের অন্য কেউ রক্ষা করতে পারে না, নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অজ্ঞতা ধূর করে জ্ঞানের আলোকে জীবনের স্বরুপ জ্ঞাত হয়ে আপন কর্মশক্তির সাহায্যে নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার জ্ঞানাআলোকে বুদ্ধ স্পষ্ট ভাবে সেই পথ চলার সন্ধান দিয়েছেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ” যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমান
তালে চলে, তা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম।”

এদিক থেকে বৌদ্ধরা খুবই ভাগ্যবান…..

অবশ্য এই ব্যাপারে আরেক মহাপুরুষ ভেন. প্রফেসর আনন্দ কৌশল্যায়না বলেছেন, ” বৌদ্ধরা এতই ভাগ্যবান যে তাদেরকে জন্মের পর
থেকেই ‘কেউনা’ নামক কোন অশরীরি শক্তির নির্দেশ, আদেশ অথবা কোন প্রেরিত বা নাজেলকৃত মতবাদকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে জীবন পরিচালনা করতে হয়না।”
ভারত বাংলা উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে –
“অজ্ঞানতারই অপর নাম ঈশ্বর। আমরা আমাদের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করতে লজ্জা পাই এবং তার জন্য বেশ ভারী গোছের একটা নামের আড়ালে আত্মগোপন করি। সেই ভারী গোছের আড়ালটির নামই ঈশ্বর। ঈশ্বর বিশ্বাসের আরও একটি কারণ হল বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অপারগতা ও অসহায়ত্ব।”

—-

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!