মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:৩৯ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
বৌদ্ধধর্মে জীবন দর্শন ও এর অনুশীলন

বৌদ্ধধর্মে জীবন দর্শন ও এর অনুশীলন


অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া: 

বৌদ্ধধর্মের অন্যতম মূল বাণী হচ্ছে অহিংসা এবং শান্তি, মৈত্রী ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সহাবস্থান করা। শুধু বৌদ্ধধর্মে কেন, অন্যান্য ধর্মের মধ্যেও এসব মর্মবাণী উচ্চারিত হয়েছে। তবে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে যে পঞ্চনীতি তাঁর মর্মার্থ অতি গভীর এবং বিশাল মানবতা সম্পর্কযুক্ত যেমন বৌদ্ধধর্মে পঞ্চশীলে আছেÑ কোনো প্রাণীকে বধ না করা বা কোনো প্রাণীকে হিংসা না করা, কোনো প্রকার চৌর্যবৃত্তি না করা, কোনো ধরনের মিথ্যা কথা না বলা, কোনো প্রকার ব্যভিচার বা যৌনাচার না করা এবং কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য সেবন না করা। এগুলো হলো সকল মানুষের জন্য সুন্দর আচরণবিধি যা সৌজন্যতা, ভদ্রতাসহ শিষ্টাচার শেখায়। এছাড়া উচ্চ আদর্শে পৌঁছার জন্য এ নীতিগুলো মানুষকে জ্ঞান-বিবেক ও দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের প্রতিও আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সকল মানুষকে সৃজনশীল কর্মে, সাম্য, মৈত্রীর মেলবন্ধনে এবং আত্মজয়ের আদর্শে উজ্জীবিত করে যা মানব সমাজকে সম্পূর্ণ মানবিক গুণাবলীকে বিকশিত করতে সাহায্য করে।

বৌদ্ধ পঞ্চশীলের প্রথম বাণীর মধ্যে যে সব অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ঘাটিত হয়েছে তা হচ্ছে পরস্পরকে হিংসা না করা, সকল জীব বা প্রাণীর প্রতি অখ- মমত্ববোধ সৃষ্টি করা এবং সকল প্রাণীর জীবনকে একইভাবে দেখা এবং পৃথিবীর সকল মানুষের প্রতি, সকল প্রাণীর প্রতি অপরিমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করা এবং সকলকে অকৃত্রিম হৃদয়ের সঙ্গে ভালোবাসা। বুদ্ধের এই পঞ্চনীতি কোনো ব্যক্তিবিশেষের ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের মানব জাতির অনুকরণীয় ও অনুশীলনীয় নীতি হতে আপত্তি কোথায়? সুতরাং বুদ্ধের পঞ্চনীতি যদি আজকের বিশ্বে সত্যিকারভাবে মেনে চলা যায় তাহলে এ পৃথিবীতে কোনো অশান্তি আর আতঙ্ক থাকতে পারে না।
সুতরাং বুদ্ধের পঞ্চনীতি ও আটটি গুণের সমাবেশই একটি মানুষের জীবন যেমন সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়, তেমনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনও জনআদর্শে পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী হয়। অতএব বুদ্ধের বহুমাত্রিক কল্যাণময়তা এভাবে মানবগোষ্ঠীকে মঙ্গলের পথে আসতে আহ্বান জানায় এবং বিশ্ব শান্তি ও বিশ্ব মানবতা গঠনে সাহায্য করে। প্রথমেই বলেছি আজ মানুষের মানবিক গুণাবলী প্রতি মুহূর্তে যেন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। তাই তো আজ সমাজ, দেশ ও বিশ্বে এতো হানাহানি, এতো নৈরাজ্য ও যুদ্ধ বিগ্রহ দেখা দিচ্ছে। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে খুন ও হত্যা করবে এটা কোন নীতি? এটা কখনো মানবনীতি হতে পারে না। আজ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের সকল স্থানে একটা সাংঘাতিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। বিরাজ করছে ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের লেলিহান শিখা। তাই আজ বিশ্বব্যাপী এতো অস্থিরতা, এতো উন্মাদনা। আবারো বলছি তাই আজ এই অস্থিরতা ও উত্তেজনা কাটানোর জন্যেই বুদ্ধের অহিংস ও সাম্যনীতি অনুসরণ করা খুবই জরুরি।

বুদ্ধের এই অহিংসবাণীকে গ্রহণ করলে মানুষ পরস্পর পরস্পরকে যেমন হিংসা করবে না, তেমনি প্রবঞ্চনাও করবে না। অন্যদিকে একে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা যেমন করবে না, চাইবে না কেউ কারো ওপর ক্রোধ বা বিদ্বেষভাব পোষণ করতে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য বিস্তার করতেও। সর্বোপরি বিশ্বের সকল মানুষের প্রতি, সকল প্রাণীর প্রতি অপরিমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করা যাবে এবং শত্রু-মিত্র সবাইকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা যাবে। এটাই বিশ্ব মানবতা ।

আমরা এও জানি ‘হিংসা’ এবং ‘অহিংসা’ এই দুটি শব্দ বিপরীতধর্মী। একটি নৈঞর্থক, অন্যটি সদর্থক। হিংসা মানুষকে পশুতে পরিণত করে, আর অহিংসা মানুষকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, ধ্যানে-মননে গুণান্বিত করে, পূর্ণ মনুষ্যত্বে নিয়ে যায়। সুতরাং বলা যায়Ñ হিংসা পশুর ধর্ম, অহিংসা মানব বা দেবধর্ম। এজন্যই বৌদ্ধবাণীতে বিধৃত হয়েছে- ‘বৈরিতা দিয়ে বৈরিতাকে কখনো উপশম করা যায় না, অবৈরিতা বা মিত্রতা দিয়েই বৈরিতাকে প্রশমিত করা যায়।’
বৌদ্ধধর্ম বলছে, বিজ্ঞানের আবিষ্কার আপাতদৃষ্টিতে সুখ-সমৃদ্ধময় মনে হলেও মানব কিংবা জীবকুলকে জরা, ব্যাধি, মৃত্যুহীনতা প্রদান করতে পারেনি। বরং মানুষের মানসিক অসুস্থতা, ভোগলিপ্সা, রাজ্য লোলুপতা, হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা, মাদকাশক্তি, নৈরাজ্য আর অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমরা বলবো বিজ্ঞানের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ শুধু ভোগবাদী বিজ্ঞান ও লোকোত্তর বিজ্ঞানের মধ্যে। ভোগবাদী বিজ্ঞান মানুষকে আগ্রাসন ও অমঙ্গলের পথে নিয়ে যায়। অন্যদিকে লোকোত্তর বিজ্ঞান মানুষকে বিমুক্তির জন্য ধ্যান ও জ্ঞান সাধনায়, শীল ও অন্তরমুখী ভাবনায় নিয়োজিত রাখে। আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি ভোগবাদী বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ফলে আজ বিশ্বের সর্বত্র নরহত্যা, যুদ্ধ ও মারণাস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো বিশ্বশান্তির হাতিয়ার হতে পারে না। আগ্রাসন এবং যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যে চলছে যুদ্ধের লেলিহান শিখা, পৃথিবীর সকল মানুষই আজ আবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা কি দেখছি? আমরা দেখছি একটি দেশের যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই অন্য যুদ্ধ একটি শুরু হয়Ñ যেমন ধরুন আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাক-ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ওই যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সিরিয়া মিসর লিবিয়া এসব দেশে যুদ্ধ চলছে। সকল মানুষ যেন আজ ভীতসন্ত্রস্থ। এগুলো ব্যবহারের ফলে হাজার-হাজার, লাখ-লাখ মানুষ, জীবজন্তু এবং পশুপাখি অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। মহামতি বুদ্ধের মতো আজ চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও বলছেনÑ মানুষের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই মারাত্মক ব্যাধি সৃষ্টি হয়। এজন্য বুদ্ধ সকল প্রকার তৃষ্ণা, কামনা-বাসনা ও লোভহীন ভাবনার কথা বলেছেন। এতেই মানুষের চিত্তে প্রকৃত মানসিক শান্তি আসতে পারে।

প্রশ্ন জাগে কেন এই ভীতি, কেন এই অস্থিরতাÑ যদি প্রশ্ন করা হয় তাহলে কারো কারো থেকে অবশ্যই উত্তর আসবে অন্যদিক থেকে। বৌদ্ধ দর্শনে এর উত্তর পাওয়া যায় অতি সহজে। বুদ্ধ বলেনÑ ক্রোধ, লোভ, দ্বেষ, মোহ এবং কামনা বাসনা থেকেই এসব নৈরাজ্য এবং যুদ্ধবিগ্রহের উদ্ভব। লোভ দ্বেষ এবং ক্রোধের বশবর্তী হয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। একে অপরকে আক্রমণ করে চলেছে। একে অন্যকে ধ্বংস করার জন্য প্রবৃত্ত হচ্ছে। এ ধ্বংস নিজেকে কিংবা ব্যক্তিজীবনকে যেমন ক্ষতি করছে, তেমনি ক্ষতি করছে দেশ তথা গোটা বিশ্বকে। এ যুদ্ধ বিজয়ের মধ্যে কোনো মহিমা নেই; নেই কোনো কৃতিত্বপূর্ণ গৌরব। ক্ষোভ বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যায় সত্যি; কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতি যে গোটা বিশ্বের নিরীহ মানুষদের দিতে হয় সেটা বোধহয় সেই সাম্রাজ্যবাদী বা আগ্রাসনবাদী রাজ্য লোলুপ শাসকরা জানেন না। যারা এই চরিত্রের তাদের উদ্দেশেই বুদ্ধের বাণী হলো এ রকম-

‘যো সহস্সং সহস্সেন সঙ্গামে মানুসে জিনে
একঞ্চ জেয়্যমত্তানং স বে সঙ্গামজুত্তমে।’

অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার সৈন্যকে পরাস্ত করা বড় কথা নয়, যিনি নিজকে অর্থাৎ নিজের রিপুসমূহকে দমন করতে পেরেছেন তিনিই প্রকৃত বিজয়ী। আমরা সবসময় অন্যকে জয় করতে চাই বিভিন্ন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। অথচ আমাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজকে জয় করতে চাই না কখনো। এর চেয়ে অগৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে? সুতরাং সেই দিক থেকে বিচার করলে বলা যায় যুদ্ধ মানব সভ্যতার জন্য এক অভিশাপ। বুদ্ধ বলেছেন মানুষের মেধার আবিষ্কার মানুষদের মারার জন্য নয়, মানবজাতিকে ধ্বংস করার জন্য নয়। আমাদের আবিষ্কার দিয়ে আমরাই মৃত্যুবরণ করবো এটা কেমন আবিষ্কার? এর চেয়ে জঘন্যতম আবিষ্কার আর কী হতে পারে?

যুদ্ধ দিয়ে কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারে না। এটা লৌকিক পরাজয় বটে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে অশোকও এমনটি গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সম্রাট অশোক বুদ্ধের এই বাণী গ্রহণ করে চ-াল অশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ না করার পূর্বে কলিঙ্গযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর মনকে দারুণভাবে আহত করেছিল। বুদ্ধের অমৃতবাণী তাঁর অশান্ত হৃদয়ে শান্তির বারতা এনেছিল। তিনি যেই বাণীটি শুনে প্রশান্তি পেয়েছিলেন সেই বাণীটি ছিল এরকম-
‘অপ্পমাদো অমতপদং, পমাদো মচ্চুনোপদং
অপ্পমত্তা ন মীয়ন্তি, যে পমত্তা যথামতা।’

‘অপ্রমাদ অমৃতের পথ, প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমাদীরা মরেন না, তাঁরা অমর। যারা প্রমত্ত তারাই মৃতসদৃশ।’ অতএব মহামতি বুদ্ধের এরকম মানবতাবাদী মতবাদ এবং অহিংসনীতি বিশ্বের সকল মানবগোষ্ঠীকে এক, অভিন্ন এবং বিশ্বমৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে উজ্জীবিত করে।
‘সকল প্রাণী সুখী হউক, ভয়হীন ও নিরুপদ্রব হউক।’এই মহামৈত্রীর মহাবাণী প্রথম বুদ্ধের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছিল। এ উদার প্রেমের মধ্যে আমরা দেখি পৃথিবীর সকল মানুষ, সকল জীব, সকল সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী এক এবং অভিন্ন করে দেখা হয়েছে। এখানে কোনো প্রাণীকে ছোট বা তুচ্ছ করে দেখা হয়নি। সূত্রনিপাত গ্রন্থের মৈত্রীসূত্রে এ বিষয়টি বিবৃত হয়েছে এভাবে : ‘সভয় অথবা নির্ভয়, হ্রস্ব অথবা দীর্ঘ, বৃহৎ অথবা মধ্যম, ক্ষুদ্র অথবা স্থূল, দৃশ্য অথবা অদৃশ্য, দূরে অথবা নিকটে যে সকল জীব জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণ করবে সকল প্রাণীই সুখী হউক।’

এ উদ্ধৃতি থেকে যে গভীর তত্ত্বটি বের হয়ে আসে সেটি হলো, এখানে শুধুমাত্র বর্তমান জীবজগতের প্রতি বুদ্ধের মৈত্রী ও করুণা বর্ষিত হয়নি, অনাগতকালের অনন্ত জীবের উদ্দেশেও বুদ্ধের অপরিমেয় মৈত্রী করুণা ও ভালোবাসা প্রদর্শিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বুদ্ধের অনুশাসন সর্বব্যাপী এবং প্রেমের অনুশাসন।’ এ উক্তির গভীরতা ও ব্যাপকত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আবার অন্যত্র মন্তব্য করেছেন, ‘আপন সন্তানের জন্য পিতা-মাতার যে দুঃসাধ্য শ্রম অথবা নিজ দল বা সম্প্রদায়ের জন্য যে দুরূহ ত্যাগ স্বীকার, এ দৃষ্টান্ত দিয়ে বৌদ্ধধর্মের করুণা ও মৈত্রীর ব্যাখ্যা করা যায় না। সাহিত্যিক আবুল ফজলও তাঁর ‘মানবপুত্র বুদ্ধ’ শীর্ষক গ্রন্থে একই কথা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তকরা শুধুমাত্র মানবগোষ্ঠীর ওপর তাদের দয়া-ভালোবাসা দেখিয়েছেন; কিন্তু মহামানব বুদ্ধ ছিলেন সেদিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মৈত্রী, করুণা ও দয়া শুধুমাত্র মানব জাতির জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না, জীবজগতের সকল প্রাণীর ওপর বর্ষিত হয়েছে।’
বৌদ্ধমতে, বিনয়, দয়া, সত্য, প্রেম, ভালোবাসা এগুলো মানবিক গুণ। এ গুণসমূহের মধ্যেই আদর্শ জীবনের মহিমা প্রকাশ পায়। এ চরিত্র গঠনের নিমিত্তেই বৌদ্ধধর্মে সকল মানুষকে আপন সন্তানের মতো ভাববার জন্য শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সূত্রনিপাত গ্রন্থে পুনরায় বলা হয়েছে : ‘মা যেমন আপন সন্তানের জীবন প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করতে চান, আপন সন্তানের দুঃখ বেদনায় কাতর হন, ঠিক একিই ভাবনা সকল সন্তান কিংবা সকল জীবের প্রতি পোষণ করতে হবে।’ কী অপূর্ব শিক্ষা বুদ্ধের। এর চেয়ে বিশ্বমৈত্রীর বাণী আর কী হতে পারে? এখানে একটি জীবনকে এমনভাবে দেখা হচ্ছে যে, যেখানে তার সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সুখ, এমনকি তার জীবনরক্ষার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ব্যক্তি তথা আমাদের ওপর নির্ভর করছে। সকল প্রাণীকে ভালোবাসার জন্য এর চেয়ে উত্তম এবং মহৎ বাণী আর কী হতে পারে? লোভ, দ্বেষ, ক্রোধ, হিংসা, স্বার্থপরতা, অপরের অনিষ্ট চিন্তা, জিঘাংসা এবং পরস্পর প্রবঞ্চনা প্রভৃতি অশুভ চিন্তায় মৈত্রীভাব বিঘিœত হয়। এগুলো অকুশল এবং অকল্যাণকর। একজন ব্যক্তি কোনো অবস্থাতেই এরূপ মনোভাব নিয়ে শুদ্ধ আচরণশীল হতে পারেন না। এগুলো সর্বতোভাবে পরিহার করতে পারলে সার্বক্ষণিক মানসিক আনন্দ পাওয়া যায় এবং শত্রুর প্রতিও ভালোবাসা উৎপন্ন হয়। এজন্যই বৌদ্ধশাস্ত্রে বলা হয়েছেÑ একজন শত্রু আরেকজন শত্রুর যতোটুকু ক্ষতি করতে না পারে তার চেয়ে অধিকতর ক্ষতি করে তার বিপথগামী চিত্ত। তাই ত্রিপিটকে উক্ত হয়েছে :‘পরস্পর পরস্পরকে বঞ্চনা করিও না, কাউকে কিছুতেই কায়মনোবাক্যে ঘৃণা করিও না এবং ক্রোধ ও হিংসাবশত কারো অনিষ্ট চিন্তা করিও না।’

এখানে এমন প্রেমের বাণী ব্যঞ্জনময় হয়ে উঠেছে যে, বুদ্ধের অনুশাসনগুলো সেকালের বিচারে তো বটেই, বর্তমান যুগের মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও মহামানবত্ব অনুভব করতে সাহায্য করে। বৌদ্ধধর্মের বিশাল মানবতাবোধ প্রসঙ্গে তাই ত্রিপুরা শংকর শাস্ত্রী বলেছিলেন, ‘বুদ্ধের বাণী বলে কথিত ধর্মপদে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ না থাকলেও তাতে আছে এক উদার অসাম্প্রদায়িক চরিত্রনীতি। আছে শম, দম, ত্যাগ ও তিতিক্ষার আদর্শ। আছে সাম্য, মুদিতা ও করুণার আদর্শ।’

বৌদ্ধধর্মে ব্রহ্মবিহার
বৌদ্ধধর্মে ব্রহ্মবিহার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মৈত্রী করুণা মুদিতা ও উপেক্ষাÑ এ চারটি গুণধর্মের সার্বক্ষণিক চিন্তা ও চর্চাকে বৌদ্ধধর্মে ব্রহ্মবিহার বলা হয়। এই ব্রহ্মবিহারই জীবজগতকে বুকে ধারণ করার শক্তি জোগায় তথা বিশ্বপ্রেম গঠন করতে সাহায্য করে। সকল জীবের প্রতি প্রেম যখন অপরিমেয় হয়, প্রতিদিন সকল অবস্থায় যখন কামনা করা হয় সকলের ভালো হোক, সকলেই সুখে থাকুকÑ সেটিই ব্রহ্মবিহার। নিম্নে এ চারটি গুণধর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো :
মৈত্রী : বৌদ্ধধর্মে ‘মৈত্রী’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। বৌদ্ধ ব্রহ্মবিহারে মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা যে চারটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে সেখানে ‘মৈত্রী’ হলো প্রথম এবং প্রধান। মিদ্ ধাতু থেকে মিত্রতা উৎপন্ন হয়। মিত্রতা শব্দ থেকেই ‘মৈত্রী’ শব্দের উদ্ভব হয়। মিত্রতা মানে ‘বন্ধুত্ব ভাব’। মানবজীবনে তথা বিশ্বের সামগ্রিক অবস্থায় ‘মৈত্রী’র গুরুত্ব যে কতো বেশি সেটা ব্যাখ্যা দিয়ে শেষ করা যাবে না। তাই বৌদ্ধধর্মদর্শন তথা ত্রিপিটকে ‘মৈত্রী’ শব্দেটি অতীব গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম সর্বদা আমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছে যে, সুন্দর এবং সামগ্রিক কল্যাণময় জীবন গঠন করতে হলে মৈত্রীর প্রয়োজন অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য। এ জন্যই স্বামী বিবেকানন্দও বলেছিলেনÑ ‘জীব প্রেম করে যে জন সে জন সেবিছে ঈশ্বর।’

প্রেম, মৈত্রী, মুদিতা, উপেক্ষা এগুলো শুধু ব্যক্তিজীবনকে ধন্য ও মহিমান্বিত করে না; পারস্পরিক সম্পর্ক, পরিবেশ ও আবহাওয়াকেও সুন্দর সুশীতল করে। এ জন্যই জীবনের সকল ক্ষেত্রে মৈত্রীর প্রয়োজন, স্নেহ ভালোবাসার প্রয়োজন এবং করুণার প্রয়োজন। এই জন্যই বৌদ্ধমৈত্রী ভাবনায় বলা হয়- ‘আমি সুখী হই, অন্যেরা ও আমার মতো সুখী হোক। আমি শত্রুহীন হই, অন্যেরাও আমার মতো শত্রুহীন হোক। আমি ভয়হীন হই, অন্যেরাও আমার মতো ভয়হীন হোক।’ এইভাবে নির্বিঘেœ জীবন যাপন করার নামই হলো বৌদ্ধমৈত্রী। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের এই মিত্রতা শুধুমাত্র নিজ বা নিজের পরিবারের জন্য নয় বিশ্বমানবের জন্য, সকল জীবের জন্য।
করুণা : ‘করুণা’ বলতে আমরা বুঝি দয়া, কৃপা, অনুকম্পা ইত্যাদি। সংস্কৃত কৃ+ উন (ণ) + আ ধাতু যোগে করুণা শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। বোধিচর্যাবতার গ্রন্থে করুণার সংজ্ঞা নিরূপিত হয়েছে এভাবে ‘আর্তে সুত ইব পিতু ঃ প্রেম জগতি’ অর্থাৎ আর্ত পুত্রের প্রতি পিতার যে প্রেম সমস্ত জগতের প্রতি সেরূপ প্রেমই হলো করুণা।
বৌদ্ধধর্মে এ করুণার স্থান অতি উচ্চে। করুণার দুটি দিক : একটি হৃদয়বৃত্তি হিসেবে অনুকম্পাবোধ; আর অপরটি হলো সেই বোধহেতু দুর্দশাগ্রস্তের দুঃখমোচনের প্রবল আকুতি। এ করুণা যার মধ্যে উৎপন্ন হয়, তার স্বার্থপরতা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি যা কিছু করেন সমস্তই পরহিতার্থেই করেন।

মুদিতা : এ শব্দটি সংস্কৃত মুদ্ + ত (র্তৃ) + আ প্রত্যয়ে গঠিত। ‘মুদিতা’ আহ্লাদিত ও প্রফুল্ল ভাব প্রকাশ করে। পরের সুখ সমৃদ্ধি দেখে যিনি আহ্লাদিত হন এবং তৃপ্তি পান সেই ব্যক্তিই মুদিতা ভাবসম্পন্ন ব্রহ্মবিহারী। নিজের স্বার্থপরায়ণতা যখন কিছুই থাকে না তখন এভাব পরিস্ফুট হয়।

উপেক্ষা : উপ+ইক্খা = উপেক্খা, এ শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হল যথাযথ নিরীক্ষণের মাধ্যমে সঠিক উপলব্ধি বা নিরপেক্ষ দর্শন; যেখানে কোনো প্রকার অনুরাগ-বিরাগ, আসক্তি বা বিরক্তি এবং কোনো প্রকার আনুকূল্য কিংবা প্রতিকূল্য থাকে না। মহামঙ্গলসূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘লাভ-অলাভ, সুখ-দুঃখ, নিন্দা-প্রশংসা, মান-অপমান, এ আট প্রকার লোকধর্মে চিত্ত যাদের প্রকম্পিত হয় না, যারা কখনো শোকগ্রস্ত হন না, যারা স্বীয় চিত্তকে রাখেন বিরজ বিমল সেই গুণসম্পন্ন লোকই ব্রহ্মবিহারী।’ এজন্য বোধিসত্ত্ব জীবনের প্রশংসাসূচক বাণী চরিয়পিটকগ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে নিম্নরূপভাবে :
শুচি বা অশুচি কিছু করিলে নিক্ষেপ;
বসুন্ধরা তাতে কভু করে না আক্ষেপ;
তেমনি তুমিও নাথ সুখে দুঃখে ভুলে;
রক্ষি সমচিত্ত চির উপেক্ষক ছিলে;
এহেন চিত্তের বলে বোধিতরু মূলে;
মরণের পরেই তুমি অমৃত লভিলে।
সুতরাং ব্রহ্মবিহারে অভিরমিত একজন বৌদ্ধ সহিংসতা পরিহারপূর্বক জাগতিক কল্যাণ সাধনে নিজকে বিলিয়ে দেন। তিনি হবেন ক্ষমাপরায়ণ, দানশীল এবং বিনয়ী। বৌদ্ধসাহিত্য ললিতবিস্তর গ্রন্থে এ মাহাত্ম্য প্রকাশ পেয়েছে এভাবে : ‘ক্ষমার গৌরবে গৌরবান্বিত হও, দান, ইন্দ্রিয়জয় ও সংযমের দ্বারা কল্যাণকর ধর্মের অনুষ্ঠান করো।‘ ধর্মপদগ্রন্থে বুদ্ধবর্গে উল্লে¬খ হয়েছে, ‘ক্ষমা এবং সহিষ্ণুতাই পরম তপস্যা।’ বৌদ্ধধর্মে ক্ষমা এবং সহিষ্ণুতাকে জীবন প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বুদ্ধের অতীত জন্ম ক্ষান্তি জাতকে। ক্ষান্তি কি? এ সম্পর্কে বৌদ্ধসাহিত্য ক্ষান্তি জাতকে সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘লোকে গালি দিলে, প্রহার করিলে কিংবা জীবন সংহার করিলেও মনের যে অক্রুদ্ধভাব তাহাই বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্ষান্তি।’

লেখক :সাবেক চেয়ারম্যান,
পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!