মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৫:৪০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
চাকমা রান্নার পদ্ধতি হেবাং নিয়ে ঢাকায় প্রিয়াংকা চাকমা

চাকমা রান্নার পদ্ধতি হেবাং নিয়ে ঢাকায় প্রিয়াংকা চাকমা


ঢাকার মানুষের কাছে চাকমা খাবারকে পরিচিত করে তুলতে দারুণ ভূমিকা রাখছেন প্রিয়াংকা চাকমা, তাঁর হেবাংয়ের মাধ্যমে। এই নারীর গল্প শোনাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

প্রিয়াংকা চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ি। এখনো তাঁদের বাস্তবতা এমন যে সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়তে আসতে পারাটাই বেশ বড় একটা অর্জন।

কিন্তু ছোটখাটো গড়নের প্রিয়াংকা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই ক্ষান্ত দেননি। এখান থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে আবার লোকাল ডেভেলপমেন্টে মাস্টার্স করে এসেছেন ইতালির পদোভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও।
প্রিয়াংকার ‘হেবাং’-এর আইডিয়ার জন্ম ইতালি থেকে আসার পর। তবে অনুপ্রেরণার শুরুটা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর রান্নার হাতও বরাবরই ভালো। আর তাদের, মানে চাকমাদের রান্নার ধরন-ধারণ তো বাঙালি রান্নার থেকে অনেকটাই আলাদা। বাঙালিরা যেখানে তেল ছাড়া রান্নার কথা ভাবতেই পারে না, সেখানে চাকমারা এক রকম তেল ছাড়াই রান্নাবান্না করে। মসলার ব্যবহারেও আছে ব্যাপক পার্থক্য। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হলজীবনের বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে তাঁর হাতের চাকমা রান্না ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের স্বাদ।

এমন খাবার তো তাঁরা আগে কখনো খাননি। আর খাবারগুলোও ভীষণ মজার। প্রায়ই তাঁদের আবদার মেটাতে হতো চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার রান্না করে খাইয়ে।
তারপর প্রিয়াংকা চলে গেলেন ইতালি। সেখান থেকে যখন ফিরে এলেন, বাংলাদেশ তখন সত্যিকার অর্থেই ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে গেছে। ফেসবুককে ভিত্তি করে প্রচুর মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা নানা ধরনের ব্যবসা করছে। অনলাইন পেজ বানিয়ে নানা সামগ্রীর পসরা বসছে ইন্টারনেটেই। অর্ডার করলে হোম ডেলিভারি দিচ্ছে। এই কর্মব্যস্ততার যুগে মানুষও এই নতুন নিয়মের কেনাকাটায় ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তখনই প্রিয়াংকার মাথায় এই আইডিয়া এলো। তা হলো, খাঁটি চাকমা খাবারের একটা অনলাইন দোকান দেওয়া। একটা নামও ঠিক করে ফেললেন। ‘হেবাং’। চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার একটা পদ্ধতি হলো—মাংস, মাছ, সবজি, শুঁটকি কলাপাতায় মুড়িয়ে বা বাঁশের চোঙে পুরে ভাপে রান্না করা। তাদের রান্নার এই পদ্ধতির নাম হেবাং। সেখান থেকেই তিনি দোকানের এই নামটা রাখলেন। ২০১৭ সালে অনলাইনে শুরু হলো হেবাংয়ের যাত্রা।

আইডিয়াটা বাস্তবায়ন করা সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল পরিবারের অন্যদের রাজি করানো। প্রথমে তাঁর পরিকল্পনা শুনে বাড়ির সবাই আসলেই আঁতকে উঠেছিল। মেয়ে বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসে কিনা বাড়ি বাড়ি খাবার বিক্রি করবে! শেষমেশ বাড়ির সবাইকে প্রিয়াংকা রাজি করাতে পারেন। একটা সুবিধা হয়, কারণ এটাই তাঁর একমাত্র জীবিকা ছিল না। পাশাপাশি বেশ সম্মানজনক একটা চাকরিও তখন থেকেই করেন।

তবে তার চেয়েও বড় সংগ্রাম ছিল ঢাকায় একটা চাকমা খাবারের দোকানকে সত্যি সত্যি ব্যবসা সফল করে তোলা। নানা দেশের হাজারো রকমের খাবার ঢাকার বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যায়। খাঁটি বাঙালি খাবারের দোকানই যেখানে অনেক সময় ব্যবসা করে টিকে থাকতে পারে না, সেখানে শুধু চাকমা খাবার নিয়ে কি ব্যবসায় টিকে থাকা যাবে? শুধু এটুকুই নয়, প্রিয়াংকা তাঁর সংগ্রামের ব্যাপ্তিটা আরেকটু বড় করে নিয়েছিলেন। ঢাকায় চাকমাদের জনসংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু সেই চাকমা জনগোষ্ঠী নয়, তিনি চাইলেন বাঙালিরাই হোক হেবাংয়ের মূল খদ্দের। বাঙালিদের সঙ্গে পরিচয় ঘটুক তাঁদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর। এভাবে পরস্পরের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ সম্পর্কে জানাশোনা হলেই না জাতিগত দূরত্ব ঘোচানো সম্ভব।

হেবাংয়ে চাকমা খাবার

হেবাংকে ঢাকার বাঙালিদের কাছে পরিচিত করে তোলার একটা উপায় লুকিয়ে ছিল প্রিয়াংকার হলজীবনের স্মৃতিতে। সেটিই কাজে লাগালেন। হেবাংয়ের কথা জানালেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেসব বন্ধু-বান্ধবীদের, যাঁরা প্রিয়াংকার রান্নার গুণমুগ্ধ ছিলেন। শুরুটা হলো তাঁদের হাত ধরেই। প্রাথমিক জনপ্রিয়তাটাও তাঁরাই এনে দিলেন। তাঁরাই তিন গোয়েন্দার ‘ভূত থেকে ভূতে’ তত্ত্বের মতো তাঁর হেবাংয়ের কথা ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। একটু একটু করে হেবাংয়ের বেশ বড় একটা খদ্দেরগোষ্ঠী গড়ে উঠল। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি অর্ডার আসতে শুরু করল। অনলাইনের এই অর্ডারগুলো ম্যানেজ করা ছিল আরেক সমস্যা। কারণ কবে কোন আইটেমের কত অর্ডার আসবে, তার তো কোনো ঠিক নেই। অথচ সে অনুযায়ী বাজার করতে হবে, রান্না করতে হবে, তারপর সেটা জায়গামতো ডেলিভারি দিয়ে আসতে হবে। প্রিয়াংকার সঙ্গে যুক্ত হলেন তাঁর দুই বোনও। তিনজন মিলেমিশে সামলাতে লাগলেন হেবাং। অথচ তাঁরা তিনজনই কিন্তু তখন সমান তালে চাকরিও করেছেন।

এ পর্যন্ত এসে থেমে গেলেও প্রিয়াংকার অর্জন নিতান্ত কম ছিল না। ঢাকার খাদ্যরসিকদের সামনে তিনি স্বাদের এক নতুন দিগন্ত মেলে ধরেছেন। এবার প্রিয়াংকা আরো এক ধাপ এগোতে চাইলেন। হেবাংকে শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলেন না। একটা সত্যিকারের দোকান না নিলে ঠিক মন ভরছিল না। এবার সেটাই করলেন। মিরপুরের কাজীপাড়ায় এমনিতেই অনেক চাকমার বসবাস। সেটাকে পুঁজি করে সেখানে শুধুই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জিনিস পাওয়া যায় এমন বেশ কিছু দোকান আছে। সেখানে দু-একটা রেস্টুরেন্টও ছিল, যেগুলোতে কিছু কিছু আদিবাসী খাবারও বিক্রি হতো। তেমনই একটা রেস্টুরেন্ট তখন উঠে গেল। প্রিয়াংকা সেই দোকানটাই ভাড়া নিলেন। সেখানেই যাত্রা শুরু করল হেবাং, ২০১৮ সালের নভেম্বরে। ঢাকার বুকে শুধুই চাকমাদের খাবার দিয়ে সাজানো আস্ত একটা রেস্টুরেন্ট। কাছাকাছি অবশ্য আরো একটি চাকমা খাবারের দোকান আছে। ওই দোকানটির নাম ‘সিএইচটি এক্সপ্রেস’।

হেবাংয়ের ইন্টেরিয়র করা হয়েছে চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ির আদলে। বাঁশের তৈরি চেয়ার-টেবিলে বসে খেতে খেতে মনে হতেই পারে, এটা বোধ হয় পার্বত্য চট্টগ্রামেরই কোনো একটা ঘর। সেখানে বসে খাওয়া যাবে নানা পদের চাকমা খাবার। দোকানের নামই যখন ‘হেবাং’, তখন সেখানে বিভিন্ন ধরনের হেবাং পাওয়া যাবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী! পাওয়া যায় মুরগির হেবাং, হাঁসের হেবাং। সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় অবশ্য বাঁশে পুড়ে রান্না করা মুরগি। এই খাবারটির চাকমা নাম ‘হরু গোরাম’। বোঝার সুবিধার জন্য অবশ্য মেন্যুতে এ খাবারটির নাম দেওয়া আছে ‘বেম্বু চিকেন’।

তবে চাকমাদের আপ্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ‘পাজন’। অনেক পাহাড়ি সবজি আর শুঁটকি একসঙ্গে রান্না করে পাজন বানানো হয়। ১০-১২ থেকে শুরু করে ৪০টা পর্যন্ত সবজির পাজন হয়। চাকমা রীতিমাফিক হেবাংয়ের প্রায় সব প্ল্যাটারেই তাই পাজন থাকে। এ ছাড়া ওরা আলাদা করেও সবজি রান্না করে। সেগুলো অবশ্য আমাদের মতো করে রান্না করে না। সিদ্ধ করে। চাকমা ভাষায় সিদ্ধ সবজিকে বলে ‘তাবা সবজি’। তাবা সবজিতে প্রায়ই সিঁদল বা অন্য শুঁটকি ব্যবহার করা হয়। চাকমারা মাছের এক ধরনের তেল ছাড়া তরকারি রান্না করে। একে বলা হয় ‘হলা’। নানা মাছের হলাও এখানে পাওয়া যায়। এ ছাড়া মিলে শামুকের বিভিন্ন পদও।

চাকমারা সব খাবারেই অনেক ঝাল দেয়। গরম গরম ভাত দিয়ে ঝাল ঝাল এসব তরকারি খেতে মজাও লাগে বেশ। হেবাংয়ে গেলে শুধু চাকমা তরকারিই নয়, ভাতের সঙ্গে খাওয়া যাবে নানা পদের ‘গুদেয়ি’ আর ‘হরবু’। ‘গুদেয়ি’ হলো চাকমাদের ভর্তা। আর ‘হরবু’ হলো সালাদ। ওরা প্রায় সব সালাদেই শুঁটকি ব্যবহার করে। এসব খাওয়ার পর তৃপ্তির ঢেকুরটা যাতে ঠিকঠাক তোলা যায়, তাই আছে চাকমাদের নানা ডেজার্টও। পাওয়া যায় জুমের বিন্নি চালের পায়েস। আর নানা পদের চাকমা পিঠা—কলাপিঠা, বড়াপিঠা ইত্যাদি।

সব মিলিয়ে প্রিয়াংকার হেবাংয়ে গেলে ঢাকায় বসেই চাকমা খাবারের পূর্ণ স্বাদ পাওয়া সম্ভব। অনেকে নিচ্ছেনও। অনেকেই মজে গেছেন চাকমা খাবারের স্বাদে। তবে এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি প্রিয়াংকা। তিনি মূলত চাকমা খাবারের সঙ্গে বাঙালিদের পরিচিত করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। হেবাংয়ের অনলাইন যুগে সে পথে ভালোই এগোচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু দোকান যুগের খদ্দেরদের একটা বড় অংশই চাকমা। অথচ প্রিয়াংকার স্বপ্ন, তাঁর হেবাংয়ে সারা দিন বাঙালিদের ভিড় লেগে থাকবে। এখন তিনি সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন। ইচ্ছা আছে হেবাংয়ের আরো কয়েকটি শাখা খোলার। বিশেষ করে ঢাকার ‘রেস্টুরেন্টপাড়া’গুলোয়। যখন তাঁর হেবাং সারা দিন বাঙালিদের আনাগোনায় গমগম করবে, আসলে তখনই তিনি সত্যিকার অর্থে পরিতৃপ্তির সঙ্গে বলতে পারবেন, বাঙালির রসনাবিলাসে তিনি চাকমা খাবারের স্বাদ যুক্ত করতে পেরেছেন।

হেবাংয়ে স্বাগত

সুত্রঃ কালের কন্ঠ

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!