শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
মাঘী পূর্ণিমায় বুদ্ধের জীবনদর্শনের শিক্ষা

মাঘী পূর্ণিমায় বুদ্ধের জীবনদর্শনের শিক্ষা


ড. সুকোমল বড়ুয়া:

আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধদের জন্য এটি এক শোকাবহ তিথি। এ তিথিটি বুদ্ধ জীবনের নানা ঘটনায় স্মরণীয় হলেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল এ দিনেই মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ দীর্ঘ ৪৫ বছর জীবজগতের কল্যাণের জন্য ধর্ম প্রচার করার পর তার মহাপ্রয়াণ বা পরিনির্বাণ দিবস ঘোষণা করেন। এ দিনেই তিনি অলৌকিক ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন।

ভগবান বুদ্ধ বেলুর গ্রামে তার শেষ বর্ষাবাস যাপন করেন। পরে তিনি বৈশালী চলে আসেন। সেদিন ছিল মাঘী পূর্ণিমা। বুদ্ধ মধ্যাহ্ন আহার গ্রহণের পর তার প্রধান সেবক স্থবির আনন্দসহ চাপাল চৈত্যে আসেন। সেখানে এসে তিনি তার প্রিয় শিষ্য আনন্দকে আহ্বান করে বললেন, ‘হে আনন্দ! তথাগত ইচ্ছা করলে অনেক অনেক বছর বাঁচতে পারে। কিন্তু আমার মহাপ্রয়াণ দিবস অতি সন্নিকট।’ এভাবে বুদ্ধ তিনবার স্থবির আনন্দকে বললেন। কিন্তু পাপীমারের কারণে স্থবির আনন্দ বুদ্ধের কথার অর্থ বুঝতে পারেননি। ফলে বুদ্ধকে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার জন্য আনন্দ আর প্রার্থনাও করতে পারেননি।

বুদ্ধগণ ইচ্ছা করলে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারেন। কিন্তু মানবরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন বলেই বুদ্ধগণের আয়ুক্ষয় হওয়া জাগতিক ধর্ম। বৌদ্ধদর্শনে একেই বলে ‘আয়ু সংস্কার’। এ দিনেই বুদ্ধ তার পরিনির্বাণ দিবস ঘোষণা করে আয়ু সংস্কার বিসর্জন দেন।

এ সময়ে সেবক আনন্দ জল আনার জন্য অন্যত্র চলে গেলে সেই পাপীমার বুদ্ধের সামনে এসে দাঁড়ায় এবং বুদ্ধকে মহাপরিনির্বাণের জন্য অনুরোধ জানায়। সেই মাঘী পূর্ণিমাতেই ভগবান বুদ্ধ ঘোষণা দেন, তিন মাস পর অর্থাৎ আসন্ন বৈশাখী পূর্ণিমায় তিনি পরিনির্বাণ প্রাপ্ত হবেন। তাই আজকের এ মাঘী পূর্ণিমা মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধের ‘মহাপরিনির্বাণ দিবস’ ঘোষণার তাৎপর্যকেই বহন করে।

সেদিন বুদ্ধ কর্তৃক ঘোষিত পরিনির্বাণের এ করুণ সংবাদ ভিক্ষুসংঘের কাছে পৌঁছলে তারা শোকে মুহ্যমান হয়েছিলেন। সেদিন বুদ্ধের পরিনির্বাণের এ দুঃসংবাদটি ভিক্ষুসংঘরা কোনোমতেই মেনে নিতে পারেননি। তাই তারা শোকে ও বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন। বুদ্ধ তাই তার শিষ্যদের আহ্বান করে বলেছিলেন, হে ভিক্ষুগণ! তোমরা শোকে, বিলাপে এত মুহ্যমান হয়েছ কেন? এ জীবন তো নশ্বর, এ জীবন তো অনিত্য। এ জীবনের সব সংস্কার ধর্মও অনিত্য। এ বিশ্বে উদয়-বিলয়ই তো জগতের ধর্ম। পৃথিবীর চারদিকেই চলছে জীবজগতের মৃত্যু আর ক্রন্দন। জন্ম যার আছে, মৃত্যুও তার আছে। জীবন মাত্রই মৃত্যুমুখী। জগতের এ সত্যকে কখনও অমান্য করা যাবে না। বুদ্ধের এ অনিত্য-দর্শন এ জগতে কত সত্য-দর্শন, আজ ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারি না।

তিনি ভিক্ষুসংঘকে আরও সেদিন বলেছিলেন, হে ভিক্ষুগণ! ‘অপ্পমাদেন সম্পাদেথ। অত্ত দীপং বিহারথ, অত্ত সরণং অনঞ্ঞ সরণং।’ অর্থাৎ ‘তোমরা অপ্রমাদের সঙ্গে জীবনের সব কর্ম সম্পাদন করো। তোমরা নিজেই নিজের দীপ জ্বালাও, নিজের দ্বীপ প্রতিষ্ঠা করো। আত্মশক্তি অর্জন করো। নিজ ধ্যান-সাধনায় এবং নিজের মুক্তির পথে নিজেই অগ্রসর হও। অন্য কারও ওপর নির্ভর কোরো না। এমনকি কোনো অদৃশ্য তৃতীয় শক্তির ওপরও না। আমি জগতে নেই তোমরা এরূপ মনে করবে না। আমার ভাষিত উপদেশ ও বাণীগুলোই তোমাদের নির্বাণের পথ দেখাবে।’ এটিই ছিল ভিক্ষুসংঘের প্রতি ভগবান বুদ্ধের শেষ উপদেশ। জীবনবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য বুদ্ধের কী অপূর্ব উপদেশ? এ উপদেশের কথা কি আমরা কখনও চিন্তা করি? তাই এদিন বৌদ্ধরা মঠ ও বিহারে গেলেও অধিক আড়ম্বর করেন না। শুধু দীপ-ধূপ প্রজ্বলন করেন, আর বুদ্ধগণ ত্রিরত্ন-গুণ স্তুতি করেন। তারা অনিত্য চিন্তা করেন এবং দিনব্যাপী অনিত্য ভাবনায় নিমগ্ন থাকেন।

আমরা জানি, বৌদ্ধ জীবনদর্শনে ‘মৃত্যু’ এক শাশ্বত শব্দ। মৃত্যু চিরন্তন। মৃত্যু সর্বভুক এবং মৃত্যু সর্বগ্রাসী। মৃত্যু যে কত ভয়ানক, কত প্রচণ্ড এবং জীবনের যে একটি কঠিনতম অভিশাপ, বুদ্ধ সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছেন। আমরা যে আজ সংসার দেখছি, এই যে মানুষের রূপ-যৌবন দেখছি, আর যে মানুষের বিত্ত-বৈভব দেখছি, বুদ্ধের দৃষ্টিতে এ সবই অনিত্য ও অবিনশ্বর। এগুলো সবই ক্ষণস্থায়ী। এগুলো কখনও স্থায়ী হতে পারে না। হতে পারে না অমর, আর চির শাশ্বত। বুদ্ধ বলছেন, যে বস্তু ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর, সে বস্তু অনিত্যধর্মী। সুতরাং পার্থিব এ বিষয়ের প্রতি এত লোভ-লালসা কেন? কেন এত হানাহানি? কেনইবা এত বৈরিতা? কেনইবা এত জিঘাংসা? অতএব বুদ্ধের ভাষায় বলতেই হয়- ‘সব্বে সঙ্কারা অনিচ্চাতি যদা পঞ্ঞায় পস্সতি, অথো নিব্বন্তিতে দুক্খে এসো মগ্গো বিসুদ্ধিয়া।’ অর্থাৎ সংস্কার মাত্রই অনিত্য ও বিনাশধর্মী। অতএব পণ্ডিত ও জ্ঞানীগণ এ অনিত্য-সংস্কার বুঝতে পেরেই তারা অনিত্য জীবনদর্শনে গভীরভাবে নিবেদিত হন। অনিত্য ভাবনা করেন।

কিন্তু আমরা কেউ বুঝতে চাই না জগতের এই অনিবার্য সত্যটিকে অনুধাবন করতে। তারপরও আমরা আমিত্বে, অহংবোধে, আত্মশ্লাঘায় সিংহের মতো গর্জে উঠি। চিত্তে থাকে আমাদের প্রচুর বিত্ত-বাসনা। থাকে আমাদের চিত্তে গগনচুম্বী লোভ। ধন, জন, মান, বিত্ত, খ্যাতি- এগুলোই যেন আমাদের জীবনসর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোর মোহে যেন আমরা আবিষ্ট হয়ে থাকি। এজন্য মৃত্যুর কোনো চিন্তাই করতে পারি না। তাই তো আমরা বিবেকবর্জিত হয়ে সব ধরনের পাপাচারে লিপ্ত থাকি। চাই না বিবেকবোধ দিয়ে কোনো ভাল-মন্দ কাজ করতে। নেই কোনো মানবিক সুচিন্তা, নেই কোনো আত্মহিত ও পরহিত ভাবনা। অন্তর্মুখী জ্ঞানের সাধনা তো নেই বললেই চলে। তাই বৌদ্ধরা মাঘী পূর্ণিমার এ দিনে অনিত্য দর্শনে, মনুষ্যত্ব গুণে এবং বিবেকবোধে উন্নত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়।

এ পূর্ণিমায় চট্টগ্রামের নানা অঞ্চলে মেলা বসে; যেমন- পটিয়ার ঠেগরপুনিতে বুড়াগোঁসাই মেলা, রাউজানের বিনাজুরিতে পরিনির্বাণ মেলা, লাঠিছড়িতে বুদ্ধমেলা, ফটিকছড়ির আবদুল্লাপুরে শাক্যমুনি মেলা এবং কক্সবাজারের রামু সীমা বিহারে মাঘী পূর্ণিমা মেলা প্রভৃতি। এ মেলাগুলো আমাদের শোক আর বেদনাকে এবং আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে যথার্থভাবে তুলে ধরে।

অতএব চলুন আমরা আজ এ শুভ মাঘী পূর্ণিমায় বুদ্ধের অনিত্য-জীবনদর্শন শিক্ষালাভ করি। আপন অন্তর্মুখী জ্ঞান সাধনার শিক্ষালাভ করি এবং আত্মদর্শন ও আত্মজিজ্ঞাসায় নিজকে গভীরভাবে উপলব্ধি করি। আমাদের সব রকম অহংবোধ, আত্মশ্লাঘা, চিত্তবিকারসহ সব ধরনের চিত্তমালিন্য ও হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করি। মানবতায় এবং মনুষ্যত্ব গুণে আমাদের জীবনকে আলোকিত করে তুলি। সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু- জগতের সকল জীব সুখী হোক।

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!