সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
রামুতে স্বর্গপুরীর মিলন মেলা

রামুতে স্বর্গপুরীর মিলন মেলা


সুনীল বড়ুয়া : ছায়া সুনিবিড় গ্রামের টিলার উপর অবস্থিত উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার। সেই বিহারের বিশাল মাঠজুড়ে তৈরী করা হয়েছে প্যাঁচঘর বা চক্রবাঁক। এ প্যাঁচঘরের ঠিক মাঝখানে বাশঁ,কাঠ,কাগজ ও রঙের নানা কারুকাজে তৈরি করা হয়েছে দো’তলা স্বর্গ। এটি স্বর্গের কল্পিত রূপ। সেই স্বর্গ প্রদক্ষিণেই চলছে মহা আনন্দ যজ্ঞ।
সং সেজে নানা বাদ্য বাজিয়ে নেচে গেয়ে উল্লাস করতে করতে প্যাঁচ ঘরের আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে আরোহন করছে সেই কাংখিত স্বর্গে। দো’তলা এ স্বর্গ থেকে নেমে আবার ঘুরতে ঘুরতে চলে আসছে বাইরে। এ সময় ঢোলের তালে তালে গাইছে বুদ্ধ কীর্তন-‘স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এল,বুদ্ধ বল বলরে; বুদ্ধের মত দয়াল আর নাই রে’।সে যেন এক অন্যরকম উৎসব।
গতকাল শুক্রবার (২০ এপ্রিল) মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য দেখা গেছে কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের ঐতিহ্যবাহী স্বর্গপুরি উৎসব ও ব্যুহচক্র মেলায়। ৩৩তম এ উৎসবের আয়োজন করে বিহার পরিচালনাা কমিটি। মূলত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এ উৎসব হলেও সকল সম্প্রদায়ের লোকজনের অংশগ্রহন ছিলো চোখে পড়ার মতো।
থরে থরে সাজানো ফুলের বাগান। পুষ্পপল্লবে সুভিত, বাগানে নানারকম ফুলের মাঝে বসে অপসরিদের মেলা। কেউ গাইছে, আবার কেউ নাচছে। এখানে কোনো রকম দুঃখ কাউকে ষ্পর্শ করতে পারে না। এই হল স্বর্গের কল্পিত রূপ। কোন মানুষ চাইলেই বহু আকাঙ্খিত এ স্বর্গে পৌঁছাতে পারে না। সংসার চক্রে ঘুরতে ঘুরতে জীবদ্দশার ভালো কর্মের প্রভাবে এক পর্যায়ে মানুষ স্বর্গে আরোহন করতে স্বক্ষম হয়, আবার পুনঃজন্মগ্রহণ করে মর্ত্যলোকে ফিরে আসে। মূলত এ ধারনা থেকেই উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহারে দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এ উৎসবের আয়োজন চলছে।
আয়োজকেরা জানান, প্রায় আড়াইশত বছরের পুরানো এ বৌদ্ধ বিহারে ৩৩ বছর আগে তৎকালীন বিহার অধ্যক্ষ প্রজ্ঞামিত্র মহাথের রামুতে প্রথম ‘স্বর্গপুরী’ উৎসব’ প্রচলন করেন। ২০০৭ সালে প্রজ্ঞামিত্র মহাথের’র প্রয়ানের পর, তাঁর প্রধান শিষ্য সারমিত্র মহাথের বিহারের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহন করেন। এর পর থেকে গ্রামবাসির সহযোগিতায় স্বর্গপুরী উৎসব আয়োজনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন সারমিত্র মহাথের।
বিহারের দায়ক নির্মল বড়–য়া জানান, চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবের পরে স্বর্গপুরি উৎসবকে ঘিরে গ্রামবাসী অন্যরকম আনন্দে মেতে ওঠেন। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে সপ্তাহ-পাঁচদিন আগে থেকে গ্রামের বউ ঝিয়েরা নাইয়র আসেন। শিশু-কিশোর থেকে আবাল বৃদ্ধ বনিতার জন্য এ উৎসব অন্য রকম আনন্দ বয়ে আনে।
হাজারীকুল গ্রাম থেকে উৎসবে আসা দর্শনার্থী বিজয়া বড়–য়া বলেন,রামুতে আসার পর থেকে অনেক দিন ধরে এ উৎসবের কথা শুনে আসছি। এখানে না আসলে বুঝতে পারতামনা,গ্রামের মানুষ এ উৎসবকে ঘিরে কি নির্মল আনন্দে মেতে ওঠেন। সত্যিই আমি অভিভূত।
‘উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক,সং সেজে নেচে-গেয়ে প্যাঁচঘর প্রদক্ষিণ করতে করতে স্বর্গে আরোহন। আর কোনো কিছুর সহযোগিতা ছাড়া দুটি লম্বা বাঁশের উপর যুবকের হেঁটে হেঁটে প্যাঁচঘর প্রদক্ষিণ অবাক করা কান্ডই বটে’। এভাবেই অনুভুতি ব্যক্ত করলেন রামু প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক খালদ শহীদ।
প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের অধ্যক্ষ সারমিত্র মহাথের জানান, শুধু রামু-কক্সবাজার নয়,জেলার বাইরে নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলী কদম, বান্দরবান থেকেও পুণ্যার্থীরা এবারে উৎসবে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া রামু উপজেলার প্রায় ১২টি গ্রাম থেকে যুবকেরা দল বেধেঁ, সং সেজে উৎসবে যোগ দেন।
বিহার পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারন সম্পাদক নীতিশ বড়–য়া জানান, বর্তমানে এ উৎসব শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। সকল ধর্মাবলম্বীদের লোকজনের অংশগ্রহনে এটি এখন সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ উৎসবে হাজারও নর-নারী ছাড়াও শতাধিক বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রামন অংশ গ্রহন করেন।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক, আমাদের রামু ডট কম সম্পাদক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, স্বর্গপুরী উৎসব এটি কালের পরিক্রমায় সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ অংশে পরিণত হয়েছে। মানুষ মূলত জীবদ্দশায় যে কর্ম করে, সে কর্ম অনুযায়ী বিভিন্ন কুলে তার জন্মান্তর ঘটতে পারে। স্বর্গপুরী উৎসবের মাধ্যমে এমন ধারণা দেওয়া হয়। সংসারে মানুষ জন্ম-মৃত্যুর গোলক ধাধাঁয় পড়ে ভবচক্রে ঘুরতে ঘুরতে কখনো স্বর্গও লাভ করতে পারে। কিন্তু সেখান থেকেও নির্দিষ্ট একটা সময়ের পরে তাকে চ্যুত হতে হয়।
নিজ কর্মগুণে, কর্মদোষে মানুষ বিভিন্ন কুলে জন্ম গ্রহণ করছেন। এমন বৌদ্ধিক ধারণা থেকেই রামুতে স্বর্গপুরী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন বৌদ্ধপল্লী থেকে ভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে নেচে গেয়ে বৌদ্ধ কীর্তন সহকারে দল বেঁধে যুবকেরা এ উৎসবে যোগ দেন। স্থানীয় ভাষায় তাদেরকে বলা হয় ‘কান্ডবাজি’। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ প্রাণভরে এই উৎসব উপভোগ করেন।
দক্ষিন চট্টলার বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের বলেন, প্রায় শতবর্ষ আগে রামুর ঐতিহাসিক রামকোট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারে ‘জগৎঠাকুর’ নামের এক বৌদ্ধ সংস্কারক এ উৎসবের আয়োজন করেন। উৎসব শুরু হতো বাংলা নববর্ষের শুরুতে। চলত টানা সাত দিন। বর্তমানে এ মেলা রামকোটের মেলা নামে পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে এ মেলা পরবর্তীতে স্বর্গপুরী উৎসবে রূপ নেয়। তবে বাংলাদেশে কবে কখন কিভাবে এ উৎসবের যাত্রা শুরু হয় তা সুষ্পষ্ট ভাবে জানা যায় নি। তবে বর্তমানে রাঙামাটি ও কক্সবাজারে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
প্রজ্ঞামিত্র বন বিহারের অধ্যক্ষ সারমিত্র মহাথেরর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন,রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাং শাজাহান আলী,রামু থানার অফিসার ইনচার্জ মো. লিয়াকত আলী প্রমুখ।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!