শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান ২০২০ এর তালিকা বরণ ও বারণের শিক্ষায় সমুজ্জ্বল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আগামীকাল প্রবারণা পূর্ণিমা, শুক্রবার থেকে কঠিন চীবর দানোৎসব রামু ট্র্যাজেডির ৮ বছর: বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা অনোমা সম্পাদক আশীষ বড়ুয়া আর নেই প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ধারন হল বিশেষ আলেখ্যানুষ্টান বৌদ্ধ ধর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাত মেলালো ভারত-শ্রীলঙ্কা রাঙ্গামাটিতে থাইল্যান্ড থেকে আনিত দশটি বিহারে  বুদ্ধমূর্তি বিতরণ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়
বুদ্ধবচন ‘ত্রিপিটক’ বাংলা ভাষায় অনূদিত : কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

বুদ্ধবচন ‘ত্রিপিটক’ বাংলা ভাষায় অনূদিত : কিছু প্রাসঙ্গিক কথা


ড. জিনবোধি ভিক্ষু: 

‘অক্‌খরমেকেকং হি বুদ্ধরূপং সমযং সিযা,
তস্মা হি পণ্ডিতো পোসো লিখেয্যং পিটকত্তযং’

অর্থাৎ, ত্রিপিটক শাস্ত্রের এক একটি অক্ষর বুদ্ধ সদৃশ। সে কারণে পণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষে ত্রিপিটকের বাণী প্রচার করা উচিত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে মহামানব বুদ্ধের আবির্ভাব এবং তাঁর সাধনালব্ধ জ্ঞান দুটোই বিস্ময়কর বিষয়। তাঁর সাধনাদীপ্ত এবং প্রজ্ঞাদীপ্ত জীবন বিশ্বের বোধসম্পন্ন মানুষকে অভিভূত যেমন করেছেন তাঁর জীবন দর্শন ও জীবনোপলব্ধির বিষয়টিও অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে শুধু নয় তাঁর এক একটা বাণী এক একটা মহান আদর্শে পরিণত হয়েছে। আজ তাঁর অমৃতময় মহান শান্তির বাণীগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে একেকটি মহিমা জাগিয়ে তুলেছে।

তাই বিশ্বসাহিত্য ভাণ্ডারের ইতিহাসে বুদ্ধ ও তাঁর বচনগুলো এক অভিনব এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। মানবের অনন্ত দুঃখমুক্তির পথ-প্রদর্শনই এ মহান বুদ্ধবচনের মুখ্য উদ্দেশ্য। বিমুক্ত মহাপুরুষ তথাগত বুদ্ধের সাধনালব্ধ অর্জিত জ্ঞান হলো মুক্তির বাণী। এটা সম্পূর্ণ বুদ্ধজীবনে দীর্ঘ সাধনা সংযমতা এবং অপরিসীম ত্যাগমহিমা ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত। বলতে গেলে বুদ্ধের ধর্মদর্শন হলো বাস্তববাদী, বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিনির্ভর এবং জীবন দর্শন। যেখানে বর্ণ-বৈষম্য তথা জাতপাতের বালাই নেই। সাম্প্রদায়িক মনোভাব অনেকটা উৎখাত করা হয়েছে। সর্বজনীন ও মুক্ত বৌদ্ধিক চিন্তাচেতনার বিশেস্নষণের প্রোজ্জ্বল দিগ্‌দর্শন। এ নীতি কার্যকারণের ওপর ভিত্তি করে সুপ্রতিষ্ঠিত। সর্বস্তরের মানুষের সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় হৃদয়ঙ্গম করার মানসে বিনয়, সূত্র এবং অভিধর্ম এ তিনটি স্তরে বিভাজনপূর্বক ত্রিপিটক নামে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ত্রিপিটকের ‘ত্রি’ মানে তিন এবং ‘পিটক’ (বিকল্পে পেটক) শব্দের অর্থ পাত্র বা ঝুড়ি। অন্যমতে ‘পিটক’ শব্দের অর্থ ঝুড়িতে বা আধারে রক্ষিত পাণ্ডুলিপি (পুঁথি)। ‘পিটক’ শব্দ ঐতিহ্য ¨ (TRADITION) অর্থেও প্রযোজ্য। প্রাচীন ভারতে গুরু-শিষ্যপরম্পরায় মৌখিক ঐতিহ্যে শাস্ত্রাদি সংরক্ষণের রীতি প্রচলিত ছিল। লিপিবদ্ধ করার রীতি প্রচলিত হওয়ার এই শাস্ত্র পৃথক আধারে রক্ষিত হতো, বুদ্ধবচন সংরক্ষণের জন্য শ্রেণিবিন্যস্ত রচনা-সংগ্রহ অর্থে ‘পিটক’ শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়েছিল মনে হয়। বর্তমান পালি ত্রিপিটক তিনটি পিটকের সমষ্টি; যথা : (১) বিনয়পিটক-বৌদ্ধসংঘের বিবিধ কর্মে এবং ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের নিয়মাবলি সম্পর্কিত রচনা-সংগ্রহ; (২) সূত্রপিটক-বুদ্ধের ধর্মদেশনা, ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যামূলক গদ্যে-পদ্যে রচিত সূত্র-সংগ্রহ এবং (৩) অভিধর্মপিটক-উচ্চতর ধর্মের তত্ত্ব বা ধর্মের উচ্চতর সূক্ষ্ম তত্ত্বালোচনা বিষয়ক রচনা-সংগ্রহ।

সূত্রপিটকে আলোচিত ধর্ম বা চিত্ত বিষয়ক শিক্ষার বিশদভাবে বিশেস্নষণমূলক ব্যাখ্যাই অভিধর্মপিটকের প্রতিপাদ্য বিষয় (চৌধুরী, ড. বিনয়েন্দ্রনাথ, বৌদ্ধসাহিত্য; সম্পাদক : ড. সুকোমল চৌধুরী, মহাবোধি বুক এজেন্সী, কলকাতা-১৯৯৫)। ত্রিপিটকের বিভিন্ন গ্রন্থে আমরা বুদ্ধবচনের নয়টি অঙ্গের (নবাঙ্গ সত্থুসাসন) উল্লেখ দেখতে পাই। নয়টি অঙ্গ হলো-(১) ‘সুত্ত’ (সূত্র) অর্থাৎ গদ্যে ধর্মোপদেশ, (২) ‘গেয়্য’ অর্থাৎ গদ্য ও পদ্যে মিশ্রিত ধর্মোপদেশ, (৩) ‘বেয়্যাকরণ’ (ব্যাকরণ) অর্থাৎ ব্যাখ্যা বা টীকা বৌদ্ধ সংস্কৃত ও পালি নিদান কথায় ভবিষ্যদ্বাণী অর্থে বেয়্যাকরণ শব্দটি প্রযুক্ত হয়েছে, (৪) ‘গাথা’ অর্থাৎ ছন্দোবদ্ধ রচনা বা কবিতা, (৫) ‘উদান’ অর্থাৎ সারবান সংক্ষিপ্ত আবেগময় উক্তি, (৬) ‘ইতিবুত্তক’ অর্থাৎ এটা তথাগত বলেছেন এরূপ উক্তি আরম্ভ করে ক্ষুদ্র ভাষণ, (৭) ‘জাতক’ অর্থাৎ বুদ্ধের অতীত জীবনের কাহিনি, (৮) ‘অব্‌ভুতধম্ম’ (অদ্ভুতধর্ম) অর্থাৎ অলৌকিক ক্রিয়ার বিবরণ; (৯) ‘বেদলস্ন’ অর্থাৎ প্রশ্নোত্তর বা কথোপকথনে ধর্মোপদেশ। বুদ্ধবচন বা শাস্তার শাসনের এই নবাঙ্গ, কিন্তু ত্রিপিটকের বিভিন্ন বিভাগ নয় কিংবা ত্রিপিটকের বিশেষ গ্রন্থকেও বুঝায় না। এর দ্বারা পালিশাস্ত্রের বিভিন্ন রচনাপদ্ধতির শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।

ত্রিপিটক কখন সংগৃহীত ও লিখিত হয় : তথাগত বুদ্ধ দীর্ঘ পঁয়তালিস্নশ বছর স্বীয় সাধনালব্ধ অর্জিত জ্ঞান জীবজগতের হিত-সুখ কামনায় প্রচার করেছিলেন। তখনো কিন্তু ত্রিপিটক সংগৃহীত এবং লিপিবদ্ধ করা হয়নি। তাঁর মহাপরিনির্বাণ লাভের তিন মাস পর শাস্ত্রজ্ঞ মহাপণ্ডিত মহাকাশ্যপ মহাস্থবিরের সভাপতিত্বে মগধরাজ অজাতশত্রুর একান্ত পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ষড়ভিজ্ঞ পাঁচশত অর্হৎ ভিক্ষুর উপস্থিতিতে এক মহাসঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজগৃহের (বর্তমান রাজগির) বৈভার পর্বতের সপ্তপর্ণী গুহায় সাত মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত এই মহাসঙ্গীতিতে বুদ্ধের ধর্ম-বিনয় সংকলিত হয়। মহাপণ্ডিত মহাকাশ্যপ ছিলেন প্রশ্নকর্তা এবং বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ স্থবির ও উপালি স্থবির ছিলেন উত্তরদাতা। বিনয়ের উত্তরদাতা বিনয়শীল উপালি এবং সূত্রের উত্তরদাতা ছিলেন আনন্দ স্থবির। উপস্থিত অন্যান্য ভিক্ষুরা সেগুলোকে অনুমোদন করেন। মৌখিক আবৃত্তির মাধ্যমে প্রথম সংগৃহীত হয় মাগধী ভাষায় এ ধর্ম-বিনয়। স্মৃতিবিপুল অর্হৎগণ বিনা লিপিতে স্মৃতিদর্পণেই এই ত্রিপিটক বুদ্ধবাণী রক্ষা করেন। পরবর্তী সিংহলের রাজা বট্টগামনীর শাসনামলে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চতুর্থ মহাসঙ্গীতির অধিবেশন হয়। মেথেলের অশোক বিহারে পাঁচশত পণ্ডিত ভিক্ষুর উপস্থিতিতে এবং পণ্ডিত স্থবিরের সভাপতিতে এ মহাসঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। রাজার আদেশে সমস্ত ত্রিপিটক ও এর অর্থকথা তালপত্র বা ভূর্জপত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। এভাবেই চতুর্থ মহাসঙ্গীতিতে ত্রিপিটক প্রথম লিখিত হয় পালি ভাষায়। এটাই বর্তমান পালি ত্রিপিটক। ত্রিপিটক বা বুদ্ধবাণীর সঙ্গে বুদ্ধের জীবন ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। উল্লেখ্য যে, পালিসাহিত্য ও বৌদ্ধদর্শনের ইতিহাস রচনার জন্য তৃতীয় বৌদ্ধ মহাসঙ্গীতির মূল্য অত্যধিক। এতে শুধু বিবিধ বিনয় সম্পর্কিত মতভেদের বিষয় আলোকিত হয়েছে তা নয় ‘কথাবত্থু’ নামক মূল্যবান একটি গ্রন্থ রচনার পটভূমিকাও তৈরি হয়। ‘কথাবত্থু’ গ্রন্থে বৌদ্ধদর্শনের বহু মূল্যবান তত্ত্ব প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচিত। তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল পণ্ডিত মোগ্‌গলিপুত্ত তিস্‌স স্থবিরের নেতৃত্বে এবং মহামতি সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক পণ্ডিতদের মতে ‘কথাবত্থু’ অভিধর্মপিটকের গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বশেষ রচিত এবং এটাই একমাত্র গ্রন্থ যার রচয়িতার নাম সিংহলী ঐতিহ্য হতে জানা গিয়েছে। সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীর পূর্বে অভিধর্মপিটকের গ্রন্থগুলোর রচনা আরম্ভ হয়েছিল (Wintermitz; History of Indian Literature. ii. P.ii)।

বুদ্ধবচনের বিশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দ্বিতীয় মহাসঙ্গীতি। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের একশত বছর পর রাজা কালাশোকের রাজত্বকালে বৈশালীতে বিনয়শীল পণ্ডিত রেবত স্থবিরের সভাপতিত্বে তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে সাতশ অর্হৎ ভিক্ষু অংশগ্রহণ করেন এবং আট মাসব্যাপী এই মহাসঙ্গীতির কার্য চলেছিল। এতে বজ্জীপুত্রীয় কতিপয় ভিক্ষু বুদ্ধের বিনয়ের নিয়ম ভঙ্গ করে দশটি আলাদা নিয়ম বুদ্ধবাণীতে অন্তর্ভুক্ত করার অপচেষ্টা করেছিলেন। স্থবির যশ কাকন্দক পুত্র বজ্জী ভিক্ষুদের এরূপ আচরণের প্রতিবাদ করার দরুন বজ্জী ভিক্ষুগণ সম্মিলিতভাবে স্থবির যশকে ‘পটিসারণীযকম্ম’ নামক দণ্ড কর্ম প্রদান করেন। যশ স্থবির অপরাধী এবং দুর্বিনয়ী ভিক্ষুদের কথায় কর্ণপাত না করে বৈশালীবাসী গৃহীদের কাছে অধর্মের হাত থেকে বুদ্ধধর্মকে রক্ষা করার জন্য আহ্বান জানালে বজ্জী ভিক্ষুরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় যশ স্থবিরের ওপর ‘উক্‌খেপনীয় দণ্ডকর্ম’ আরোপ করেন। এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে যশ স্থবিরকে সংঘ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে সংঘ দুভাগে বিভক্ত হয়। বজ্জীপুত্রীয় ভিক্ষুসংঘ যে সকল নিয়ম ভঙ্গ করেন এগুলোকে একত্রে দশ বত্থুনিঁ বলা হতো।

সেই সময় মহামান্য সম্ভূত সানবাসী অহোগঙ্গ পর্বতে অবস্থান করছিলেন। তিনি উক্ত দশ বত্থুনি সম্পর্কে যশ স্থবিরের প্রতিবাদের বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হন এবং পশ্চিম-ভারতে ৬০ জন প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ এবং দক্ষিণ ভারতের ৮৮জন ভিক্ষু সম্ভূত স্থবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এগুলোর আশু সমাধানের জন্য সুব্যবস্থা করেন। তাঁরা সবাই বুঝতে পারলেন যে, ‘দশ বত্থুনি’ বুদ্ধের বিনয়বহির্ভূত এবং ভবিষ্যতে ভিক্ষুগণের বিরাট ক্ষতি এবং অনিয়ম হবে। তাঁরা সানবাসীর পরামর্শক্রমে সকলে মহামান্য রেবত মহাস্থবিরের সাক্ষাৎ করেন। বিনয়শীল পণ্ডিত রেবত স্থবির সমস্ত বিনয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবেচনা করেন। যশ স্থবিরের পক্ষে রায় প্রদান করেন, দশবত্থুনী বিনয় সম্মত নয়। বজ্জী ভিক্ষুগণের এটি পরিত্যাগ করা কর্তব্য (বড়ুয়া, ড. রবীন্দ্র্র বিজয়; পালি সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী; ঢাকা-১৯৮০, পৃ. ৩৩৩)।

তখন সঙ্গীতির মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে ‘দশ বত্থুনি’ অবিনয়সম্মত বলে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। চূলবগ্‌গে উল্লেখ করা হয়েছে, সব্বকামী সঙ্গীতি সভায় ধর্মাসন অলংকৃত করেন এবং রেবত স্থবির সভাপতির আসনে উপবিষ্ট হয়ে সঙ্গায়ন কার্য পরিচালনা করেন এবং সাতশ অর্হৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। প্রথম মহাঙ্গীতির অনুকরণে সমস্ত কার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে বহুপ্রকার বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশেষে সর্বসম্মতিক্রমে আটজন ভিক্ষু দ্বারা একটি কারক সভা গঠিত হয়। পূর্ব ভারতীয় চারজন এবং পশ্চিম ভারতীয় চারজন ভিক্ষু এতে অংশগ্রহণ করেন। মহাবংশে নিম্নলিখিতভাবে তাঁদের নাম দেওয়া হয়েছে। যথা : সব্বকামী, সালথ, খুজ্জসোভিত, বস্‌ভু (এই চারজন প্রাচীনকা) এবং রেবত, সম্ভূত সানবাসী, যশ কাকন্দক পুত্ত এবং সুমন (এই চারজন পাবেয়্যক) (পালি সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৪)।

থেরবাদী বৌদ্ধরা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর থেকে সর্বমোট পাঁচটি সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম তিনটি সঙ্গীতি বুদ্ধের পরিনির্বাণের তিনশ বছরের মধ্যে মগধে অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ মহাসঙ্গীতি সিংহলে এবং পঞ্চম সঙ্গীতি রাজা মিনডনের রাজত্বকালে মান্দালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ১৮৭১ সালে। পূর্বোক্ত সঙ্গীতিতে ত্রিপিটক আবৃত্তি ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত। চতুর্থ সঙ্গীতির অবসানে সিংহল রাজ বট্টগামনীয় আদেশে সমস্ত ত্রিপিটক অট্‌ঠকথা ভূর্জপত্রে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং পঞ্চম সঙ্গীতির অবসানে ত্রিপিটক ত্রিপিটক গ্রন্থগুলো মান্দালয়ে হিলে ৭২৯টি মার্বেল পাথরের মধ্যে বিনয়পিটক ১১১টি, সূত্রপিটক ৪১০টি, আর অভিধর্মপিটক ২০৮টি মার্বেল পাথরে খোদিত করা হয় (পালি সাহিত্যেও ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৪)।

আরও উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৫৪ সালে ২৫০০তম বুদ্ধজয়নত্মী বর্ষে ব্রহ্মদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সদ্ধর্মানুরাগী উ নু-র পৃষ্ঠপোষকতায় ২৪জন বিশিষ্ট ও উপাধিপ্রাপ্ত ভিক্ষুদের নিয়ে সুপ্রিম সংঘ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। ভিক্ষুদের মধ্যে অগ্রমহাপণ্ডিত মহারাষ্ট্রগুরু উপাধিপ্রাপ্ত ঞো এতং ছেয়াদ নামে প্রখ্যাত অশীতি বৎসর বয়স্ক মহামান্য রেবত মহাস্থবিরকে এই সঙ্গীতির নায়ক নির্বাচিত করা হয়। ৬ বছর যাবৎ এই সঙ্গায়ন চলেছিল। বিশ্বের শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ষষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসঙ্গীতি রেঙ্গুনের বুদ্ধশাসন কাউন্সিলের উদ্যোগে কাবা আয়ে বিশ্বশান্তি প্যাগোডায় অর্থাৎ মহাপাষাণ গুহায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উক্ত মহাসঙ্গীতিতে দেশ-বিদেশের ২৫০০ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ভিক্ষুগণ উপস্থিত ছিলেন। এই সঙ্গীতিতে ত্রিপিটক বিশোধনসহ বার্মা ভাষায় লিপিবদ্ধ করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পালি ভাষায় বিরচিত ত্রিপিটক : তথাগত বুদ্ধের মহান বাণীকে ভিত্তি করে ত্রিপিটক সংকলিত হয়েছিল ত্রিপিটকের ভাষা পালি ভাষা নামে খ্যাত। তৎকালীন সর্বসাধারণের বোধগম্য ভাষা ছিল পালি। যে ভাষাতে বুদ্ধ সদা সর্বদা উপদেশ প্রদান করতেন। আজ সারা বিশ্বের পালি ভাষার চর্চা ও গবেষণা অপরিহার্য শুধু নয় মানবজীবন গঠনে বুদ্ধবাণী সত্যিই অভূতপূর্ব ও সর্বজনীন যা মানুষকে মানুষের পদমর্যাদা যুগে যুগে উন্নীত করেছে। পরবর্তীকালে সিংহল, ব্রহ্মদেশ, শ্যাম, চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে ত্রিপিটক এবং ত্রিপিটকবহির্ভূত বহু পালি গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। পালি ভাষার ত্রিপিটক একান্তভাবে থেরবাদী বা বিভজ্জবাদীদের অবদান। পালি সাহিত্যের ইতিহাস বিরাট ও বিসত্মৃত। পালি ভাষার তথাগত বুদ্ধের মুখনিঃসৃত ভাষা হিসেবে প্রতিভাত। অর্থকথাকার আচার্য বুদ্ধঘোষের সময়ে (খ্রিষ্টীয় ৫ম শতাব্দী) ‘পালি’ শব্দটি ত্রিপিটক মূল গ্রন্থ বুঝাতে প্রযুক্ত হতো। চূলবংসে উল্লেখিত আছে : ‘পালিমত্তং ইধানীতং ন অট্‌ঠকথা এব’ অর্থাৎ পালিই শুধু এখানে (সিংহল) আনীত হয়েছে, অর্থকথা (টীকা) নয়। বুদ্ধঘোষ নিজেও তাঁর অর্থকথাগুলোতে পালি শব্দটি একই অর্থে প্রয়োগ করেছেন। অর্থকথায় পালি শব্দের প্রতিশব্দগুলো পাওয়া যায়। আবার সিংহলী ঐতিহ্যে ত্রিপিটকের ভাষাকে অর্থাৎ পালির ভাষাকে বলা হয়েছে মাগধী নিরুক্তি অর্থাৎ মগধের ভাষা। বুদ্ধঘোষ ও বুদ্ধবচনের ভাষাকে মাগধী নিরুত্তি বলেছেন (চৌধুরী, ড. বিনয়েন্দ্রনাথ, বৌদ্ধসাহিত্য, মহাবোধি বুক এজেন্সী, কলকাতা-১৯৯৫, পৃ. ৭)।

ত্রিপিটক শাস্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস : পালি ত্রিপিটক গ্রন্থগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে দেখানো হয়েছে; যথা : ১। বিনয়পিটক, ২। সূত্রপিটক, ৩। অভিধর্মপিটক। তন্মধ্যে বিনয়পিটক একুশ হাজার, সূত্রপিটক একুশ হাজার এবং অভিধর্মপিটক ৪২ হাজার সর্বমোট ৮৪ হাজার ধর্মবাণীর মধ্যে ৮২ হাজার বুদ্ধভাষিত এবং অবশিষ্ট ২ হাজার শ্রাবকভাষিত। বুদ্ধের দেশিত উপদেশগুলো সাধারণত ধর্মস্বন্ধ নামে অভিহিত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন :

‘দ্বাসীতি বুদ্ধতো গণ্‌হি দ্বে সহস্‌সানি ভিক্‌খুতো,
চতুরাসীতি সহস্‌সানি যে মে ধম্মা পবত্তিতো’।

তথাগত বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণকালে ভিক্ষুগণকে বলেছিলেন, এই চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ রইল। এতদিন আমি একাই তোমাদের উপদেশ দিয়েছি ও অনুশাসন করেছি। আমার পরিনির্বাণের পর এই চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ তোমাদের উপদেশ দেবে এবং অনুশাসন করবে। এ কারণে বৌদ্ধশাস্ত্রে উক্ত চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ বা ত্রিপিটক বুদ্ধের ধর্মকায় বিবেচিত হয়ে থাকে। বিনয়পিটক পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত; যথা : ১। পারাজিকা, ২। পাচিত্তিয়, ৩। মহাবর্গ, ৪। চূলবর্গ ও ৫। পরিবার পাঠ। এই বিনয়পিটক মূলত ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের নিত্য প্রতিপাল্য শীল বা নীতিনিয়মগুলো দৃষ্টান্তসহ বর্ণিত ও ব্যাখ্যাত এবং শীল লঙ্ঘনের শাস্তি ও তার প্রায়শ্চিত্তাদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘বিনয়’ শব্দের অর্থ পরিচালনা, নিয়ম বা নীতি-শৃঙ্খলা, ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের সামগ্রিক জীবন-যাপন ও আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ-সংক্রান্ত আলোচনা শাস্ত্রই বিনয়পিটক।

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেছেন, ‘বিনযনাম বুদ্ধসাসনস্‌স আযু। বিনযং ঠিতে বুদ্ধসাসনং ঠিতং হোতি’্ল-অর্থাৎ বিনয় বুদ্ধশাসনের আয়ুস্বরূপ। বিনয় ছাড়া বুদ্ধশাসনের স্থিতি অকল্পনীয়। জগতের সকল বস্তুই কোনো নিয়ম, শৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত হয়। বিশ্বজগৎ নিয়ম-শৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত হয়। বিশ্বজগতে নিয়ম-শৃঙ্খলাহীনভাবে কোনো বস্তু বর্তমান থাকতে পারে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও নিয়ম-শৃঙ্খলা, অমিতব্যয়িতা, প্রমত্ততা, আলস্যপরায়নতা, দুঃশীলতা প্রভৃতি সমস্ত প্রকার উন্নতির পরিপন’ী। অপরপক্ষে নিয়ম, শৃঙ্খলা, সংযম, আত্মত্যাগ, চরিত্রবল, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা, নিয়মানুবর্তিতা, উদ্যম-উৎসাহ সকল প্রকার উন্নতির মূল। তথাগত বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের শ্রীবৃদ্ধির জন্যই বিনয়ের শিক্ষাপদগুলো বিধিবদ্ধ করেছিলেন। এই নিয়মাগুলো তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের জন্য অপরিহার্য। তাই বুদ্ধ বলেন, ‘যদি কোনো ভিক্ষু শতবর্ষব্যাপী ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করেও যদি শীল পালনে বিমুখ হয়, তবে তাকেও নিরয়ে গমন করতে হয়।’ অপরপক্ষে পাত্রচীবর ধারণ তারই শোভা পায়, যার শীল সুনির্মল। শীলবান ব্যক্তির প্রব্রজ্যা জীবন সুখকর হয়।

আরও বলা হয়েছে : ‘যে ব্যক্তি বিনয় বিষয়ে অজ্ঞ, তার পক্ষে শিক্ষাপদ পালন করা বাতুলতা মাত্র’। সাধনমার্গে অগ্রসর হলে প্রথমেই শিক্ষাপদগুলো পালন করা অবশ্যই কর্তব্য। দুঃশীল ব্যক্তির কখনো সমাধি লাভ হয় না। বিনয়-শিক্ষাপদ সমাধির ভিত্তিস্বরূপ। এই কারণে বিনয়ের পঠন-পাঠন একান্ত প্রয়োজন, বিনয়পিটকের প্রতিটি গ্রন্থ এসব নীতি-নিয়মে ভরপুর, যা অনুধ্যান ও অনুশীলন করলে উন্নত মার্গ ও ফলজ্ঞানে উন্নীত হতে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয় সূত্রপিটক-এ পিটকও পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত; যথা : ১. দীর্ঘনিকায়, ২. মধ্যমনিকায়, ৩. সংযুক্তনিকায়, ৪. অঙ্গুত্তরনিকায়, ৫. খুদ্দকনিকায়।

আবার খুদ্দকনিকায়ের অন্তর্গত ১৫টি গ্রন্থ; যথা : ১) খুদ্দক পাঠ, ২) ধর্মপদ, ৩) উদান, ৪) ইতিবুত্তক, ৫) সূত্রনিপাত, ৬) বিমানবত্থু, ৭) প্রেতবত্থু, ৮) থেরগাথা, ৯) থেরীগাথা, ১০) জাতক, ১১) নির্দেশ, ১২) প্রতিসম্ভিদামার্গ, ১৩) অপদান, ১৪) বুদ্ধবংশ ও ১৫) চরিয়াপিটক।

তথাগত বুদ্ধের উপদেশগুলো এই পিটকে সংগৃহীত। তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য, উপাসক-উপাসিকাদের যখন যে উপদেশ প্রদান করেছেন সেই উপদেশগুলো এবং অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজক, শ্রামণ, ব্রাহ্মণ, রাজা, মহারাজা, ক্ষত্রিয়, রাজমহামাতা প্রভৃতির সঙ্গে বুদ্ধের আলাপ-আলোচনা হয়েছিল তা সূত্রপিটকে সংগৃহীত হয়েছে। এতদ্ব্যতীত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, উপাসক-উপসিকাদের আত্মরক্ষার জন্য যা বলেছেন তাও এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। বিনয়পিটক যেমন বৌদ্ধসংঘের ইতিহাস ও সংঘের মধ্যে ভিক্ষু-ভিক্ষুদের জীবনযাত্রার আচরণবিধি বানিয়ে রচিত এবং শীল বিষয়ক শিক্ষার ওপর আলোকপাত করে, তেমনই বুদ্ধপ্রচারিত ধর্মের মূলতত্ত্ব ও সেই তত্ত্বগুলোর বিশদ বিশেস্নষণ এবং নৈতিক উপদেশ সূত্রপিটকে বিধৃত আছে। বুদ্ধের আধ্যাত্মিক ধ্যানসাধনার তিনটি পর্যায়-শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা-সূত্রপিটকে সুব্যাখ্যাত রয়েছে। চতুরার্যসত্য, কার্যকারণতত্ত্ব, নির্বাণ প্রভৃতি বুদ্ধের ভৌগোলিক বিবরণ এবং প্রাক-বৌদ্ধযুগের ধর্মীয় বিশ্বাস ও দার্শনিক চিন্তাধারার ওপরও সূত্রপিটক আলোকপাত করে।

তৃতীয় অভিধর্মপিটক-এ পিটক সাত খণ্ডে বিভক্ত; যথা : ১) ধর্মসঙ্গণী, ২) বিভঙ্গ, ৩) ধাতুকথা, ৪) পুদ্‌গল-প্রজ্ঞপ্তি, ৫) কথাবত্থু, ৬) যমক ও ৭) পট্‌ঠান। ত্রিপিটকের তৃতীয় ও শেষ বিভাগ হলো ‘অভিধর্মপিটক’। ‘অভি’ উপসর্গের সঙ্গে ধম্ম শব্দটি যোগ করে অভিধর্ম পদ গঠিত হয়েছে। ‘অভি’ উপসর্গের অর্থ অতিরিক্ত বা অধিকতর। এখানে ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ চিন্তনীয় বিষয়। সুতরাং অভিধর্মের অর্থ অতিরিক্ত ধর্ম বা অধিকতর ধর্ম। বলা বাহুল্য বুদ্ধের সেই দার্শনিক তত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বমূলক দেশনাই ‘অভিধর্ম’ নামে অভিহিত। আচার্য বুদ্ধঘোষ তাঁর অত্থসালিনী গ্রন্থের ভূমিকায় নিম্নলিখিতভাবে অভিধর্মপিটকের পরিচয় প্রদান করেছেন। পরম কারুণিক ভগবান বুদ্ধচরিত অসংখ্য লক্ষকল্প পারমীপূর্ণ করার পর ছয় বছর কঠোর তপশ্চরণ বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুমমূলে উপবিষ্ট হয়ে সর্বজ্ঞতা জ্ঞান লাভ করেন। তিনি সেই বোধিদ্রুমমূলে উপবেশন করে চিন্তা করতে গিয়ে ‘আমি এই আসনে উপবেশন করে আড়াই হাজার ক্লেশ পরিত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছি’। আচার্য বুদ্ধঘোষ অভিধর্মের অর্থ করেছেন ধর্মের অতিরিক্তই অভিধর্ম। এর সঙ্গে Metaphysics বা অধিবিদ্যার কোনো সম্পর্ক নেই (Wintermitz. HIL. II, p. ১৬৫)। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও অভিধর্মের আলোচ্য বিষয় প্রায় একরূপ (বৌদ্ধ সাহিত্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৫)। সূত্রপিটকে শীলধর্ম ও দার্শনিক তত্ত্বের যে তালিকা পাওয়া যায় অভিধর্মপিটকে সেই মাতিকা বা তালিকার বিশদ ও পরিবর্ধিত রূপ পাওয়া যায়। অভিধর্মপিটক সূত্রপিটকের পরিপূরক বলা যায়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে সূত্রকেই অভিধর্মের ভিত্তি বলা হয় (Wintermitz. HIL. II, p. ১৬৬)।

অভিধর্ম বুদ্ধের ধর্মদর্শনের গভীর মননশীল তার চরম বিকাশ। অভিধর্মে প্রকৃষ্ট জ্ঞান ছাড়া কেউ উত্তম ধর্মকথক হতে পারে না।

বুদ্ধবচন ত্রিপিটক বৌদ্ধ সাহিত্য একদিকে মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ অন্যদিকে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বশান্তির বার্তা বহন করে। বুদ্ধবাণী এমনতর বাণী যেখানে মানুষের যা কিছু প্রয়োজন সবই উল্লেখিত রয়েছে। ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনীতি, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, শিল্পকলা, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, সাহিত্য, দর্শন, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞানের সর্বদিকসহ দেহতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বের গভীর বিষয়াবলি সগৌরবে সময়োপযোগী বাস্তবতা ও বিজ্ঞান-মনস্কতার সম্যক পরিচয় বহন করে। বুদ্ধবচন ত্রিপিটক শাস্ত্রের গ্রন্থগুলো পালি ভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ভাষান্তরিত হয়েছে। যে যে দেশের মানুষ বুদ্ধবচন বিষয়ে যথেষ্ট পারঙ্গমতা লাভে ধন্য ও কৃতার্থ; যেমন : ইংরেজি, দেবনাগরী, বার্মা, সিংহলী, থাই, হিন্দি ইত্যাদি ভাষায় সম্পূর্ণ ত্রিপিটক গ্রন্থ অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

পালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক : বাংলা ভাষার সঙ্গে পালি ভাষার সম্পর্ক খুবই বেশি গভীর। এই পালি ভাষা বহুদিন ধরে পাক-ভারতের বৃহত্তর অংশের কথিত ভাষা ছিল। কালক্রমে তা প্রাক মৌর্য ও মৌর্যযুগে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্থান অধিকার করে। এমতাবস্থায় প্রায় ১৮০০ বৎসর ধরে এই ভাষার অধ্যয়ন অধ্যাপনা ও আলোচিত হওয়ার ফলে ওইসব অঞ্চলের স্থানীয় কথ্য ভাষার ওপর পালির প্রভাব বিশেষভাবে প্রকট। বাংলা, হিন্দী, নেপালি, অসমীয়া, বর্মী ও সিংহলী ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে পালি ভাষার জ্ঞান অপরিহার্য।

চর্যাপদ বা চর্যাগীতির সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক : কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে পালি-প্রাকৃত ভাষা হতে বাংলা ভাষার উদ্ভব। ভাষার ক্রমবির্বতনের ধারা অনুসারে অপভ্রংশই মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার শেষ স্তর। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হলো চর্যাপদ বা চর্যাগীতি। অপভ্রংশ ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। চর্যাপদের ভাষায় প্রাচীনতম বাংলার সাহিত্যের রূপ বিধৃত। এই প্রাচীন বাংলায় আধুনিক চলিত বাংলার পূর্বসূরি। সুদূর পালি সাহিত্যের যুগ হতে বর্তমান চলিত বাংলার যুগ পর্যন্ত ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে একটি সামঞ্জস্য রয়েছে। এই সামঞ্জস্য সাধারণত শব্দ, বাক্যাংশ ও ক্রিয়াপদে বিদ্যমান। কিন্তু সাধু বাংলায় এর প্রভাব কিছুটা কম বললেই চলে। এসব শব্দ, বাক্যাংশ ও ক্রিয়াপদে এমন সব অর্থ থাকে যার ব্যঞ্জনা, অভিধেয় অর্থ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষত বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশের ধারা, ধ্বনি, শব্দগুচ্ছ, বাগধারা পালি ভাষা ও বৌদ্ধসাহিত্যের বিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত (বড়ুয়া, রবীন্দ্র বিজয়; পালি সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮০, পৃ. ১৬)।

বর্তমান বিশ্বে বাংলা ভাষা এক সমৃদ্ধ ভাষা। এটি আজ বিশ্ব মাতৃভাষার গৌরব অর্জন করেছে। বাংলা ভাষা এই বন্ধুর পথযাত্রায় যাদের অবদান সর্বাগ্রে স্মরণীয় তাঁরা হলেন, চুরাশী সিদ্ধাচার্য নামে খ্যাত। তাঁরা দোঁহা, গীতিকা ও সাধনভূমির গ্রন্থাদি প্রণয়ন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহান ধারাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সময়ে পণ্ডিত শীলভদ্র, শান্তিদেব, শান্তিপাদ, কমলশীল, সরোরুহ বজ্র (পদ্মবজ্র), শান্তরক্ষিত, কুক্কুরিপাদ, শবরীপাদ, নাগবোদি, জেতারি, অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান, জ্ঞানশ্রী মিত্র, অভয়াকর গুপ্ত, প্রজ্ঞাভদ্র, বোধিভদ্র, প্রজ্ঞাবর্মা প্রভৃতি বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে বৌদ্ধ তথা বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের চর্যাপদ রচনার উত্তরকাল থেকে আধুনিককালে বৌদ্ধদের সাহিত্য অঙ্গনে বিচরণের নব প্রভাত বলা যায়। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধ্যান-ধারণা ও জ্ঞানসাধনার এক অমূল্য অবদান। সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যা বা কবিতা বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্য নিদর্শন। এই ভাষা থেকে কালক্রমে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়। সে-কারণে সিদ্ধাচার্যগণ বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তার জনক। তাদের রচিত এই গানগুলোই আধুনিককালের চর্যাপদ বা চর্যাগীতি নামে পরিচিত।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিংশ শতকে প্রথম পাদে ১৯০৭ সালে নেপালের দরবারে পুঁথিচালা থেকে এই চর্যাপদ (চর্যাচর্যবিনিশ্চয়) আবিষ্কার করেন। পড়ে ড. প্রবোধ চন্দ্র বাগচী, ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (Buddhist Mystic Songs), সুকুমার সেন, ড. আর্নল্ড বাকের, সৈয়দ আলী আহসান (চর্যাগীতিকা), অতীন্দ্র মজুমদার (চর্যাপদ) এবং মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন (পুরাতাত্ত্বিক নিবন্ধাবলী) চর্যাপদ ও চৌরাশি সিদ্ধাচার্যের কাল্পনিক প্রতিকৃতি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। (মহাথের, শ্রী জ্যোতিপাল, চর্যাপদ, চট্টগ্রাম, ১৯৯০, পৃ. ০৫)। বলা হয়ে থাকে বাংলা গানের এক সমৃদ্ধ উপাদান কীর্তন। তাই পণ্ডিত ও ইতিহাস গবেষকদের মতে, চর্যাপদগুলোই বাংলা কীর্তনের প্রাচীনতম নিদর্শন। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ‘বাংলা সাহিত্য ও বৌদ্ধ প্রভাব’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বৌদ্ধ চর্যাপদ ও দোঁহার মধ্যে দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পরিচয় মেলে’। পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির লিখেছেন, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ চর্যাগীতি ও দোঁহাবলি সাহিত্য রচনা করে বাংলা ভাষার ভিত্তি স্থাপন করেন।

সুপ্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে পালি ভাষা ও বৌদ্ধ সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। বৌদ্ধ সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে সুবর্ণ যুগ ছিল অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে পাল আমলে। এরপর খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে ষোলো শতক তথা অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। মূলত পাল রাজত্বের অবসানে বাংলায় সেন ও বর্মন আমলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। তখন বৌদ্ধ পণ্ডিত সিদ্ধাচার্য এবং প্রাচীন বৌদ্ধ বিদ্যাপীঠগুলো অনেকটা নানাভাবে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংসাবশেষে রূপ নিয়েছে শুধু নয় বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রায় লুপ্ত বললেও ভুল হবে না।

বুদ্ধবচন পালি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় ত্রিপিটক প্রণীত : ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁ যুগসন্ধিক্ষণে বঙ্গদেশে থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণ ও ক্রমবিকাশে মহামান্য সংঘরাজ মহাপণ্ডিত সারমেধ মহাস্থবির, আচারিয়া পূর্ণাচারসহ বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে কতিপয় তরুণ সাংঘিক ব্যক্তিত্বদের আত্মত্যাগ ও প্রজ্ঞাময়তা গুণে ত্রিপিটক শাস্ত্রের নবজাগরণ সূচিত হয়েছে। বঙ্গদেশের প্রাচীন বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদি পীঠস্থান চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভিত্তি করে পুনরায় ভারতের প্রাচীন রাজধানী কলকাতা, মায়ানমার রেঙ্গুন এবং আরাকানে বঙ্গীয় বৌদ্ধ সাংঘিক ব্যক্তিত্বদের আন্তরিক সহায়তায় থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের কার্যক্রমকে বেগবান করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলা যায়। এ মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আজ পবিত্র ত্রিপিটক শাস্ত্রের বঙ্গানুবাদ প্রকাশের এগিয়ে এসেছেন দেখে আমি আনন্দে আপস্নুত এবং গৌরববোধ করছি দীর্ঘকাল। বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম পুনর্জাগরণের প্রায় দেড়শ বছর পরে এই মহৎ কাজে ‘ত্রিপিটক পাবিলিশিং সোসাইটি’ এই গুরুদায়িত্ব পালন করে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ শুধু হননি, বাংলা ভাষায় ত্রিপিটক সাহিত্যে জানার মহা সুযোগ করে দিয়ে তারা ধন্য ও গৌরবান্বিত হয়েছেন বলে মনে করি।

১৯৫৬ সালে ২৫০০তম বুদ্ধ জয়নত্মী উপলক্ষে মায়ানমার সাবেক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সদ্ধর্মানুরাগী ধর্মপ্রাণ উপাসক উ নু-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় ষষ্ঠ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন ত্রিপিটক গ্রন্থগুলো মার্বেল পাথরে খোদাই এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল যা এখনো সেই গৌরবময় কীর্তিগাথা দেদীপ্যমান। বর্তমানে এই বুদ্ধবচন পবিত্র ত্রিপিটকভুক্ত মোট ৫৯টি গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক পাবলিশিং সোসাইটি’ হতে ২৫টি খণ্ডে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সে অনুসারে আজ সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষ মহাকল্যাণমিত্র শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবিরের (বনভন্তে) দীর্ঘদিনের সংকল্প ছিল ‘বাংলা ভাষায়’ বুদ্ধবচন ত্রিপিটক গ্রন্থগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করে বাংলাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আজ তাঁর সুযোগ্য শিষ্য-প্রশিষ্যগণ একত্রিত হয়ে এই মহৎ এবং মহতী পুণ্যকর্ম সম্পাদন করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। যা ত্রিপিটক সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাসে আরেকটি নব ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে বলা যায়। যাঁরা (শাস্ত্রজ্ঞ ও পণ্ডিত ভিক্ষু ও গৃহী) এই দুর্লভ ও শ্রমসাধ্য অনুবাদের কাজে আন্তরিকভাবে মেধা ও মননশক্তি দিয়ে সহায়তা করেছেন তাঁদের মধ্যে প্রকাশনা সংস্থার তালিকা অনুসারে সকলের অবগতির জন্য গর্বিত অনুবাদকদের মধ্যে বর্তমান সম্পৃক্ত অনুবাদকদের নাম উল্লেখ করা সমীচীন বলে মনে করি। যথাক্রমে-

১। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া, ২। শ্রীমৎ প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির, ৩। শ্রীমৎ জিনবংশ মহাস্থবির, ৪। শ্রীমৎ শীলালংকার মহাস্থবির, ৫। শ্রীমৎ ধর্মতিলক মহাস্থবির, ৬। শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির, ৭। শ্রীমৎ শান্তরক্ষিত মহাস্থবির, ৮। শ্রীমৎ ঈশান চন্দ্র ঘোষ, ৯। শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে), ১০। ভিক্ষু শীলভদ্র, ১১। ড. আশা দাশ, ১২। ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাস্থবির, ১৩। ডা. সীতাংশু বিকাশ বড়ুয়া, ১৪। অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া, ১৫। শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির, ১৬। ড. বিনয়েন্দ্রনাথ চৌধুরী, ১৭। শ্রীমৎ বুদ্ধবংশ ভিক্ষু, ১৮। শ্রীমৎ করুণাবংশ ভিক্ষু, ১৯। শ্রীমৎ ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু, ২০। শ্রীমৎ বঙ্গীস ভিক্ষু, ২১। শ্রীমৎ অজিত ভিক্ষু, ২২। শ্রীমৎ সীবক ভিক্ষু, ২৩। শ্রীমৎ রাহুল ভিক্ষু, ২৪। শ্রীমৎ জ্ঞানেন্দ্রিয় স্থবির, ২৫। শ্রীমৎ প্রজ্ঞাদর্শী ভিক্ষু, ২৬। শ্রীমৎ সুমন স্থবির, ২৭। শ্রীমৎ আদিকল্যাণ ভিক্ষু, ২৮। শ্রীমৎ সম্বোধি ভিক্ষু, ২৯। শ্রীমৎ জ্যোতিপাল ভিক্ষু, ৩০। শ্রীমৎ পূর্ণজ্যোতি ভিক্ষু এবং ৩১। শ্রীমৎ জ্ঞানশান্ত ভিক্ষু।

উপরিউক্ত অনুবাদকবৃন্দ যেসব অমূল্য গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন তা হলো যথাক্রমে-প্রথম খণ্ডে পারাজিকা; দ্বিতীয় খণ্ডে পাচিত্তিয় ও মহাবর্গ; তৃতীয় খণ্ডে চূলবর্গ ও পরিবার; চতুর্থ খণ্ডে দীর্ঘনিকায় (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড); পঞ্চম খণ্ডে মধ্যমনিকায় (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড); ষষ্ঠ খণ্ডে সংযুক্তনিকায় (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড); সপ্তম খণ্ডে সংযুক্তনিকায় (চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড); অষ্টম খণ্ড অেঙ্গুত্তরনিকায় (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড); নবম খণ্ড অেঙ্গুত্তরনিকায় (পঞ্চক ও ষষ্ঠক নিপাত); দশম খণ্ড অেঙ্গুত্তরনিকায় (চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড); একাদশ খণ্ডে খুদ্দকপাঠ, ধম্মপদ, উদান, সুত্তনিপাত, ইতিবুত্তক, বিমানবত্থু, প্রেতকাহিনি; দ্বাদশ খণ্ডে থেরগাথা, থেরীগাথা, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক; ত্রয়োদশ খণ্ডে অপদান (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড); চতুর্দশ খণ্ডে জাতক (প্রথম ও দ্বিতীয়), পঞ্চদশ খণ্ডে জাতক (তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড); ষোড়শ খণ্ডে জাতক (পঞ্চম ও ষষ্ঠ খণ্ড); সপ্তদশ খণ্ডে মহানির্দেশ ও চূলনির্দেশ; অষ্টাদশ খণ্ড পে্রতিসম্ভিদামার্গ ও নেত্তিপ্রকরণ; ঊনবিংশ খণ্ডে মিলিন্দ-প্রশ্ন ও পিটকোপদেশ; বিংশ খণ্ডে ধর্মসঙ্গণী ও বিভঙ্গ; একবিংশ খণ্ডে ধাতুকথা, পুদ্গল-প্রজ্ঞপ্তি ও কথাবত্থু; দ্বাবিংশ খণ্ডে যমক (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড); ত্রয়োবিংশ খণ্ডে পট্‌ঠান (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড); চতুর্বিংশ খণ্ডে পট্‌ঠান (তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড); পঞ্চবিংশ খণ্ডে পট্‌ঠান (পঞ্চম খণ্ড)।

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা ভাষায় মূল পালি ত্রিপিটক প্রকাশ করার উদ্যোগকে স্বাগতম, অভিনন্দন এবং মহতী প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাই। বঙ্গীয় বৌদ্ধসমাজে অনেক জ্ঞানী-গুণী এবং শাস্ত্রজ্ঞ ভিক্ষু এবং গৃহীদের মধ্যে থেকে ইতিমধ্যে ত্রিপিটক শাস্ত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাংলা ভাষায় এবং পালি অক্ষরে বাংলায় প্রকাশ করে এই সমাজকে উপহার দিয়েছেন। তা কিন্তু সম্পূর্ণ ত্রিপিটক গ্রন্থগুলো নয়। সূত্র, বিনয় এবং অভিধর্মের কয়েকটি খণ্ড মাত্র। ভারত-বাংলা উপমহাদেশের অনন্য সাধক আত্মত্যাগী পুণ্যপুরুষ ভদন্ত সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে) বাংলা ভাষায় পালি ত্রিপিটক গ্রন্থগুলো প্রকাশের জন্য তাঁর সুযোগ্য-শিষ্য-প্রশিষ্যদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা এবং ধর্মপ্রাণ পুণ্যার্থী দায়ক-দায়িকাদের আন্তরিক সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

বুদ্ধের পরিভাষায় ‘সব্ব দানং ধম্ম দানং জিনাতি’। অর্থাৎ সমস্ত দানের মধ্যে ধর্মদানই হলো শ্রেষ্ঠ দান। তথাগত বুদ্ধের শাসনিক এবং পুণ্যচেতনাকে অন্তরে জাগ্রত করে এগিয়ে উদারপ্রাণ অগণিত ভক্তবৃন্দ। ধাপে ধাপে পূর্বে প্রকাশিত বহু অমূল্য গ্রন্থ এবং নতুন করে অনূদিত গ্রন্থাবলি অভিনব, দৃষ্টিনন্দন, শ্রদ্ধা ও মনোযোগ আকর্ষণ হয় মতো প্রকাশ করতে শুরু করেন। বর্তমান লেখকের পক্ষে রাজবন বিহারের প্রকাশনা কাজের সূচনাকাল থেকে সহযোগিতা করার সৌভাগ্য হয়েছে। এশিয়ার সর্বপ্রথম ডিলিট ডিগ্রীধারী ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার কর্তৃক ১৯১৩ সালে প্রণীত এবং অনূদিত ‘সতিপট্‌ঠান সূত্রের’ বঙ্গানুবাদ গ্রন্থের একটি কপি শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দেওয়ার পর উক্ত অমূল্য গ্রন্থ এবং নতুন করে অনূদিত গ্রন্থাবলি অভিনব, দৃষ্টিনন্দন, শ্রদ্ধা ও মনোযোগ আকর্ষিত হয় মতো প্রকাশ করতে শুরু করেন। লেখকের পক্ষে এ প্রকাশনা কাজের সূচনাকাল থেকে সহযোগিতা করার সৌভাগ্য হয়েছে। এশিয়ার সর্বপ্রথম ডিলিট ডিগ্রীধারী ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার প্রণীত একটি কপি শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে দেওয়ার পর উক্ত অমূল্য গ্রন্থটি পুনঃপ্রকাশের কর্ম চালু হয়েছিল। এ পর্যন্ত এই বিহার থেকে অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশ করে বুদ্ধভাবাপন্ন সাহিত্যানুরাগীদের মনের খোরাক মিটিয়ে নন্দিত হয়েছে। বর্তমানে তাঁরই বহু শিষ্য-প্রশিষ্যরা একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ পালি ত্রিপিটক গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে জনসমক্ষে উপহার দেওয়ার সুসাহসী কাজ হাতে নিয়েছে যা ইতিপূর্বে কারো পক্ষে তথা সংস্থার পক্ষে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে তা অতীব শুভ ও মঙ্গলময় বার্তা।

দুর্ভাগ্যবশত প্রায় দেড় শতাধিক বছরের অধিকাল যাবৎ বঙ্গভাষী অনেক শাস্ত্রজ্ঞ, পণ্ডিত, গবেষক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদ্যোগ না থাকার দরুন খণ্ড খণ্ডভাবে বঙ্গভাষায় কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপিটকের মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বললেও ভুল হবে না। বিশেষ করে কলকাতা বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহার, রেঙ্গুন বৌদ্ধ মিশন, ধর্মাধার বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশনী, বুড্ডিস্ট রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন সেন্টার বাংলাদেশ, প্রজ্ঞালোক প্রকাশনী, প্রজ্ঞাবংশ একাডেমী, বনভন্তে প্রকাশনী রাঙামাটি, যোগেন্দ্র রূপসীবালা ট্রাস্ট কলকাতা, চট্টগ্রাম থেকেও ব্যক্তিগতভাবে লেখক বিনয়াচার্য জিনবংশ মহাস্থবির কর্তৃক মহামুনি সংঘরাজ বিহারে থাকাকালীন ত্রিপিটকের অর্থকথাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অনুবাদ করে সমাজে উপহার দিলেও সামগ্রিকভাবে এই মহৎ কাজটি হয়ে উঠেনি।

সম্প্রতি সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষ শ্রীমৎ সাধনান্দ মহাস্থবিরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তাঁর সুযোগ্য শিষ্য-প্রশিষ্যগণ, পালি ভাষায় শাস্ত্রজ্ঞ মহান ভিক্ষুসংঘ এবং কিছু পণ্ডিত গৃহী ব্যক্তিবর্গের আন্তরিক সহায়তায় এই জাতীয় দুর্লভ গ্রন্থাদি প্রকাশ করার সুব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে দুর্বোধ্য কিছু কিছু শব্দগুলোর টিকাটিপ্পনি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পাঠকের পক্ষে বিষয়বস্তু বুঝা সহজবোধ্য হবে। যাঁরা ইতিপূর্বে এই বিষয়ের ওপর কয়েকটি খণ্ড বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে সমাজকে উপহার দিয়েছেন তাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ও ঋণ স্বীকার করছি। তাঁদের অনুবাদের পদ্ধতি ছিল অতি সহজবোধ্য এবং টিকাটিপ্পনিতে সমৃদ্ধ।

বিশেষ করে বর্তমান ২০১২ সালে ‘ত্রিপিটক পাবলিশিং সোসাইটি’ নামক একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো ত্রিপিটকের ৫৯টি বইকে মোট ২৫ খণ্ডে কম্বাইন্ড করে পূর্ণাঙ্গ ও সমগ্র ত্রিপিটক প্রকাশ একটি বিশাল দুরূহ কার্যক্রম সুসম্পন্ন করার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। সাধকশ্রেষ্ঠ পুণ্যপুরুষ বনভন্তের প্রিয়শিষ্য ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির এই সংস্থার আহ্বায়ক এবং শ্রীমৎ বিধুর মহাস্থবির, শ্রীমৎ করুণাবংশ স্থবির, শ্রীমৎ সম্বোধি স্থবির, শ্রীমৎ বঙ্গীস স্থবির, শ্রীমৎ অজিত স্থবির এবং শ্রীমৎ সীবক ভিক্ষু সদস্য হিসেবে এই মহতী কার্যক্রমকে বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন তাঁদের অশেষ কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন এবং পুণ্যদান করছি এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যাঁরা আর্থিক অনুদানসহ প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদেরও অশেষ পুণ্যদান এবং উত্তরত্তোর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

ভবিষ্যতে ত্রিপিটক শাস্ত্রের ওপর যে কয়েকটি অর্থকথাসহ মূল্যবান পালি ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদি রয়েছে তাও সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করে জাতিকে উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে খুবই খুশি হবো। এতে করে বুদ্ধের জীবন দর্শন, জীবনোপলব্ধির ও জীবনমুক্তির অমিয় বাণী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করে মানবজীবনকে সার্থক এবং মৃত্যুঞ্জয়ীর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সন্দেহ নেই। সবার মধ্যে প্রজ্ঞার উন্মেষ ঘটুক এবং প্রকৃত বুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হোক, এটাই সময়ের দাবি।

পাদটীকা :
* দশবত্থুনি-১) শৃঙ্গে পুরে লবণ জমা রাখা বিধেয়, ২) দুপুরের পর ছায়া দুই আঙুল অতিক্রম করলেও আহার গ্রহণ করা বিধেয়, ৩) এখন গ্রামে গমন করব এই ভেবে পরিতৃপ্তভাবে খেয়ে নিয়ে পুনঃ গ্রামে গিয়ে অতিরিক্ত ভোজন করা বিধেয়, ৪) এক সীমাভুক্ত বহুসংখ্যক আবাসে পৃথক পৃথকভাবে উপোসথ করা বিধেয়, ৫) পরে আগত ভিক্ষুগণকে জানাবো এই ভেবে কিছুসংখ্যক ভিক্ষু দ্বারা বিনয়কর্ম করা বিধেয়, ৬) আমার উপাধ্যায় এরূপ আচরণ করেছেন, আমার আচার্য এরূপ আচরণ করেছেন বলে সেটা আচরণ করা বিধেয়, ৭) দুধ দুধত্ব ত্যাগ করেছে অথচ এখন দধিত্বপ্রাপ্ত হয়নি। সেটা ভুক্ত প্রবারিত ভিক্ষু অতিরিক্ত হিসেবে পান করা বিধেয়, ৮) যেই সুরা এইমাত্র চোয়ানো হয়েছে, এখনো সুরায় পরিণত হয়নি। সেটা পান করা বিধেয়, ৯) ঝালরযুক্ত বসবার আসন ব্যবহার বিধেয়, ১০) সোনা, রূপা কিংবা টাকা স্পর্শ ও গ্রহণ বিধেয়। (চূলবর্গ, অনুবাদক : ইন্দ্রগুপ্ত ভিক্ষু)

 

লেখক : অধ্যাপক  ড. জিনবোধি ভিক্ষু, পালি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

Facebook Comments

শেয়ার করুন


One response to “বুদ্ধবচন ‘ত্রিপিটক’ বাংলা ভাষায় অনূদিত : কিছু প্রাসঙ্গিক কথা”

  1. mongswemarma says:

    shadu shadu shadu
    🙏 🙏 🙏

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *





© All rights reserved © 2018 tathagataonline.net
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করার চেষ্ঠা না করে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করুন
Don`t copy text!